ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধিকার

নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার বাধা দূর হোক

নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার বাধা দূর হোক
×

রেখা সাহা

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আজ নারীদের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়নের দিন। বিশ শতকের শুরুর দিকে নারী শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দিয়ে এই যাত্রার সূত্রপাত আর নারীমুক্তি আন্দোলনের বৃহত্তর স্রোতধারায় এর সম্মিলন। শত বছরের অধিক কাল ধরে চলা সে যাত্রারই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির দিন। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে নারী দিবস পালন ক্রমেই বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে।

বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর অন্যতম উপাদান নারী-পুরুষের অসম ক্ষমতা সম্পর্ক। এই অসম ক্ষমতা সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে নারী ও কন্যার প্রতি বহুমাত্রিক সহিংসতায়। প্রচলিত নানা ক্ষতিকর প্রথা, কুসংস্কার, প্রচলিত নেতিবাচক রীতিনীতি ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য টিকিয়ে রাখে। সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-আইনি বৈষম্য নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্যের শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। ক্ষতিকর সামাজিক প্রথাসহ বৈষম্যমূলক আইন নারীর জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পাহাড়সমান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। বিচার ব্যবস্থায় সমাজের বিদ্যমান অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে। 

সর্বজনীন মানবাধিকারের একেবারে প্রাথমিক বিষয় বেঁচে থাকার অধিকার, ভয় থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, নির্বিঘ্নে চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত হয় না বলেই আমাদের দেশের নারী এবং কন্যারা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে দুর্বিষহ নির্যাতন, বর্বর সহিংসতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। উদ্বেগজনক হারে বাংলাদেশে বাড়ছে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যাসহ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার নিষ্ঠুর ঘটনা। সম্প্রতি নরসিংদীতে ধর্ষণের পর কিশোরী হত্যা, পাবনায় ঘরের মধ্যে দাদি ও নাতনিকে হত্যা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গভীর জঙ্গলে ৮ বছরের ময়েকে ধর্ষণ ও হত্যা, কক্সবাজারের উখিয়ায় গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ– একের পর এক এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে সেই সঙ্গে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি এবং সে শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগে প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছে। এ তো গেল প্রকাশিত ঘটনার তথ্যচিত্র। এর বাইরে লোকচক্ষুর অন্তরালে যে অসংখ্য অত্যাচার-নিপীড়ন-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, আমরা খুব সহজেই তা অনুমান করতে পারি। কয়টা ঘটনা বিচারের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে? কয়টা ঘটনার যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে? নীরবে নির্যাতন মেনে নেওয়া, নির্যাতনকে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বৈধতা দেওয়া, ভুক্তভোগী নারীকেই অবশেষে দোষারোপ, নানা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিবেচনায় ভয়াবহ অপরাধীদেরও ছাড় পেয়ে যাওয়া; আইনের শাসন যারা নিশ্চিত করবেন, যারা বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের অসংবেদনশীল আচরণ, জবাবদিহি না থাকা নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। 

বাংলাদেশের নারী আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কাজ করছে। এই কাজের অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের দেশে সহিংসতার শিকার নারী ও কন্যারা একদিকে যেমন বিচার চাইতে গেলে বিচার পান না, আরেকদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বিচার চাইতে যান না। এর কারণ লোকলজ্জা ও সামাজিক অপবাদ, একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়, আসামিপক্ষের হুমকি, পরিবারের অসহযোগিতা, পরিবারের আর্থিক অসংগতি, বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা, আসামিপক্ষে এলাকার প্রভাবশালীদের অবস্থান, আইনি সহায়তার অভাব, পক্ষপাতিত্ব, সামাজিক-অর্থনেতিক বৈষম্য ইত্যাদি। 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই এখনও নারী ও পুরুষের জীবনে আইনের প্রয়োগ ঘটে ভিন্ন ভিন্নভাবে। আইনের এসব ফাঁকই নির্ধারণ করে কে সুরক্ষা পাবে, কাকে বিশ্বাস করা হবে, কারা অধিকার দাবি করতে পারে, কারা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত? এভাবেই আইনের বাইরে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বক্তব্যের মাধ্যমে বিচারহীনতা সমাজের গভীরে শিকড় বিস্তার করে। নারী ও কন্যার জন্য ন্যায়বিচার অর্থ পুনরায় সহিংসতার ঘটনা থেকে তাদের সুরক্ষা, তাদের কথা শোনা, বিশ্বাস করা এবং মর্যাদা দেওয়া, তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া এবং ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া।  

রেখা সাহা: সম্পাদক, কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড
উপ-পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
 

আরও পড়ুন

×