ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বায়ুদূষণ

প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ

প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বায়ুদূষণ রাজধানীর আড়াই কোটি মানুষের জন্য বৃহদাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করিলেও বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ গুরুত্ব পাইতেছে না বলিয়া শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের যে আক্ষেপ ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা সংগত। যেইখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কোনো এলাকায় বায়ুমান সূচক (একিউআই) ৩০০ অতিক্রম করিলে উহাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ অবস্থারূপে গণ্য করা হয়, সেইখানে বৃহস্পতিবার ঢাকার কয়েকটি এলাকায় এই সূচক ৬০০ অতিক্রম করিয়াছে। একই দিবসে বিশ্বের ১২৪টি শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল ঢাকা। অথচ একদিকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের সক্রিয়তা দৃশ্যমান নহে, অন্যদিকে সরকারি দপ্তরসমূহেও দৃশ্যমান তৎপরতা অনুপস্থিত।

ঢাকার এই পরিস্থিতি নূতন নহে। ৯ বৎসরের তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র-ক্যাপস দেখাইয়াছে, ২০১৬ হইতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে প্রতি বৎসরই বায়ুদূষণ পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পাইয়াছে। উক্ত ৩ সহস্র ১১৪ দিবসের মধ্যে মাত্র ৩১ তথা মাত্র ১ শতাংশ দিবসে নির্মল বায়ু নগরবাসী পাইয়াছে। দূষিত বায়ুর সহিত রাজধানীবাসীর বসবাসের কারণে উহা নীরব ঘাতকরূপে অবতীর্ণ। বায়দূষণের কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টের রোগীর অধিক সংখ্যায় হাসপাতালে উপস্থিতি আমরা দেখিতেছি। ঢাকার বিষাক্ত বায়ুর প্রভাবে অকালমৃত্যু ও মানুষের রোগব্যাধি বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞগণ বিবিধ সতর্কবার্তা দিয়াছেন। দীর্ঘ মেয়াদে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর বায়ুদূষণের প্রভাব ভয়ংকররূপে প্রতিভাত। এই কারণেই পরিবেশকর্মীদের আবেদনের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত একাধিকবার ঢাকার রায়ুমান উন্নতকরণে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা জারি করিয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, উহাও প্রতিপালিত হয় নাই।

নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত ঢাকায় শুধু বায়ুদূষণ নহে; শব্দ ও দৃশ্যদূষণও এখানে মাত্রা অতিক্রান্ত। মানব-স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় এই সকল দূষণ প্রতিরোধে প্রশাসনকে পরিকল্পিত পদক্ষেপ লইতেই হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বায়ুদূষণ মোকাবিলায় দূষণের সকল উৎসে নজর দিতে হইবে। তাই ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধে যদ্রূপ দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ লইতে হইবে, তদ্রূপ আশু কর্মসূচিও গ্রহণ করা আবশ্যক। অর্থাৎ জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীর বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস মেয়াদোত্তীর্ণ ও উপযুক্ততাহীন যানবাহন বন্ধ এবং নগরীর চতুষ্পার্শ্বের ইটখলাসমূহও কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনিতে হইবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প-কারখানায় বিশ্বমানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নিঃসরণ মান নির্ধারণ এবং ইহার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি নির্মল বায়ু আইন প্রণয়ন করা জরুরি। শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়িয়া তোলা এবং জলাশয় বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর খালসমূহ সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। ‘ব্লু-নেটওয়ার্ক’-এর এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হইলে উহা বায়ুর উন্নয়নে ভূমিকা রাখিবে বলিয়া অনেকেই ধারণা করিতেছেন। কিন্তু অনুরূপ কর্মসূচি অতীতে বহুবার গৃহীত হইলেও মধ্যপথে মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে; ইহাও বলা দরকার।

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসে বিশ্বের অন্য দেশসমূহ জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করিয়া থাকে। আমাদের রাজধানীর বায়ুদূষণের মাত্রা বিবেচনায় সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে। তবে কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নহে; নাগরিকদেরও এতদ্বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করিতে হইবে। অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার হ্রাস, তৎসহিত পরিবেশ দূষণরোধী কার্যক্রমে নাগরিক সক্রিয়তা যদ্রূপ জরুরি, তদ্রূপ অধিক সংখ্যায় বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ এলাকা রক্ষায়ও তাহারা ভূমিকা রাখিতে পারেন। সর্বোপরি, সচেতনতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলিয়া আমরা মনে করি। 

আরও পড়ুন

×