শিক্ষা খাতে ১২ দফা
সমন্বিত পদক্ষেপ সময়ের দাবি
সাব্বির নেওয়াজ
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্যতম অবহেলিত খাত ছিল শিক্ষা। মাত্র ১৮ মাসের সরকারের আমলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক সব পক্ষই নানা আন্দোলনে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন করা হলেও শিক্ষা খাত উপেক্ষিতই থেকে যায়। এ খাতের সংস্কারে কোনো কমিশন করা হয়নি। পরপর দুটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই পেতে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময় গড়িয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। নতুন মন্ত্রীরা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। এর মধ্যে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা খাতে তিন ধাপে ১২ সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন।
এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সুদূরপ্রসারী। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের উপস্থাপনায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি যে বার্তা উঠে এসেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন– শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। এ দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে রূপ পেলে তা হতে পারে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব মহলের দীর্ঘদিনের দাবি– শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা করা হোক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৪-৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয়ের সুপারিশ রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশে এ হার দেড়-দুই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সে বিবেচনায় ৫ শতাংশের লক্ষ্য শুধু আর্থিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছারও পরীক্ষা। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধি মানেই গুণগত উন্নয়ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, অর্থের ব্যবহার কতটা ফলপ্রসূ ও সময়োপযোগী হবে।
উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ ব্যয় এবং ৫৩ শতাংশ তহবিল অব্যবহৃত ফেরত যাওয়ার তথ্য উদ্বেগজনক। এটি শুধু আর্থিক অদক্ষতা নয়; শিক্ষার্থীদের শেখার সময় ও সুযোগের ক্ষতি। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদন ও স্কুল বর্ষপঞ্জির সমন্বয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যয় দক্ষতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
নতুন সরকারের পরিকল্পনায় মাধ্যমিকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যুগোপযোগী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার বিভাজন শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স চালুর পরিকল্পনা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নমনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে।
একইভাবে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা তথা আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি ভাষা শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে শিক্ষক প্রস্তুতি, মানসম্মত কনটেন্ট ও কার্যকর মূল্যায়ন ছাড়া এ উদ্যোগ কাগুজে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভাষাশিক্ষায় শোনা ও বলার দক্ষতা অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা ইতিবাচক। এটি যোগাযোগভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত।
প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারের কথা সরকারের দুই মন্ত্রী বলেছেন। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি ও ডিজিটাল লিটারেসি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ সময়ের দাবি। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, ডিভাইস বিতরণই শেষ কথা নয়। প্রশিক্ষণ, কনটেন্ট ও রক্ষণাবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যেন শিক্ষাকে সহায়ক করে; বিকল্প নয়– এ ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য।
মাধ্যমিকে ক্রীড়া বাধ্যতামূলক করা এবং বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ার পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফল নয়; শারীরিক ও মানসিক বিকাশও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরীক্ষা ও মূল্যায়নে আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন ও স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন গাইডলাইন চালুর পরিকল্পনা কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়। অতীতের অটোপাস সংস্কৃতি থেকে সরে এসে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন চ্যালেঞ্জ।
গবেষণা, জবাবদিহি ও অংশীজনের সম্পৃক্ততা ছাড়া শিক্ষা খাত বাস্তবে এগোবে না। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকায়নের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে সহায়ক হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান নয়; জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
জবাবদিহির জন্য পাবলিক ড্যাশবোর্ড, শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড ও ট্র্যাকিং নম্বরভিত্তিক ফিডব্যাক ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত না হলে এ উদ্যোগও আংশিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আমরা মনে করি, সরকার ঘোষিত ১২ দফা সংস্কার পরিকল্পনা একটি কাঠামোগত রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি বহন করে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কার কেবল মন্ত্রণালয়ের কক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সফল হবে না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এ উদ্যোগ অর্থবহ হবে।
শিক্ষাকে যদি সত্যিই ‘রাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা হয়, তবে এ সংস্কার কর্মসূচি হতে পারে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি রচনার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজে তার প্রতিফলন।
সাব্বির নেওয়াজ: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- সাব্বির নেওয়াজ
