তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ
সংসদের প্রথম দিন যেসব ঘটনার সাক্ষী হলো
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ১৮:০৭
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ভাষণ শুরুর পর ওয়াক আউট করেছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। বেরিয়ে এসে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা সরকারি দলকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, স্পিকারকে অনুরোধ করেছিলাম তাঁকে যেন ভাষণ দিতে না দেওয়া হয়। তারা আমাদের কথা গ্রাহ্য করেননি। আমরা সংক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছি।’
৭৬ শতাংশ নতুন মুখ আর স্পিকারের শূন্য চেয়ার নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন অনেকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে নজির হয়ে রইল রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রধান বিরোধী দলের ওয়াক আউট।
প্রথম দিনের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সকল যুক্তি-তর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।’ তবে নির্বাচিত ২৯৬ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২২৭ জনই প্রথমবারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন; তাদের পক্ষে সংসদের কার্যপ্রণালি, বিধিবিধান, স্থায়ী কমিটির কাজ, আইন প্রণয়নের জটিল প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে।
এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ ও এনসিপি– এই পাঁচ দলের প্রধানেরা এই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
নতুন নেতৃত্ব, বিপুলসংখ্যক নতুন সদস্য এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংসদ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। সংসদ সদস্যরা যদি দ্রুত সংসদীয় বিধিবিধান আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আরেকটি ব্যতিক্রম এবার আগের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ছাড়া প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়া। সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকারই নতুন সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। নতুন সংসদে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার পরই তাঁর দায়িত্ব শেষ হবে।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) কারাগারে। এমন পরিস্থিতিতে আজ সংসদ কক্ষে স্পিকারের আসনটি ফাঁকা রেখেই শুরু হয় অধিবেশন।
১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পরে কখনোই স্পিকারের পদটি শূন্য থাকেনি। এর আগে এক এগারোর সেনা সমর্থিত সরকারের মেয়াদে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পরও বিএনপি মনোনীত স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে শুরু হয়েছিল নতুন সংসদ।
ডেপুটি স্পিকার পদটি বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী সেটা নেবে কিনা, গতকাল পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিসহ ‘পুরো প্যাকেজ’ চেয়েছিল। তবে ডেপুটি স্পিকারের বিষয়েও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল বিএনপি। শেষ পর্যন্ত প্রথম দিনের অধিবেশনে নির্বাচিত হয়ে স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম; ডেপুটি স্পিকার হয়েছেন কায়সার কামাল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের আরও একটি ব্যতিক্রম হচ্ছে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ– সর্বশেষ এই তিনটি সংসদই গঠিত হয়েছিল বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। তিনটি ছিল একতরফা সংসদ। তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিরোধী দল ছিল জাতীয় পার্টি। তিনটি সংসদেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর পর ক্ষমতার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, যার ফলে সংসদে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এদিকে প্রথম অধিবেশনের সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট নিয়ে আগে থেকেই জটিলতা শুরু হয়েছিল। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে বাধা দিতে ও তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসনে এখন আর কোনো সাংবিধানিক সংকট নেই। সংসদ এখন আইনগতভাবে এই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে।
এদিকে সংসদ অধিবেশনের সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের ইঙ্গিত দিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আগেই বলেছিলেন, তারা মনে করেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে জামায়াত কী ভূমিকা নেবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বুধবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বৃহস্পতিবার তাদের ভূমিকা দেখা যাবে। সেই ভূমিকাই দেখা গেল অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় তাদের ওয়াক আউটের ঘটনায়।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- জাতীয় সংসদ
- স্পিকার
- প্রধানমন্ত্রী
- সংসদ সদস্য
- সংসদ ভবন
