ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘দুবাইয়ে এমন আতঙ্ক আগে দেখিনি’

প্রবাসীরা বলছেন, জীবন-জীবিকা দুটোই সংকটে

‘দুবাইয়ে এমন আতঙ্ক আগে দেখিনি’
×

শরিফুল হাসান

শরিফুল হাসান

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ২১:৪৬

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফ্লাইট ছাড়ার কথা রাত সাড়ে ৮টায়। কিন্তু বোর্ডিং কার্ড নিতে গিয়ে জানা গেল অন্তত তিন ঘণ্টা দেরি হবে। ফ্লাইট ছাড়বে রাত সাড়ে ১১টায়। কারণ দুবাই থেকে বিএস-৩৪৪ ফ্লাইটটি দেরিতে ছেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার অভ্যন্তরীন ফ্লাইট হলেও ইউএস বাংলার এই ফ্লাইটটি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসবে। ফলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

১২ মার্চের কথা বলছি। অভিবাসন বিষয়ক একটা কর্মশালা শেষে ঢাকায় ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। রাত সোয়া দশটায় ফ্লাইট এল। চট্টগ্রাম ছাড়ল ১১টা ২৩ মিনিটে। ফ্লাইটে দুবাই থেকে আসা অনেক যাত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে ঢাকায় এলাম। বরাবরের মতোই ফ্লাইট রানওয়ে ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষ নামার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন উত্তেজনায়। বিমানে থাকা ক্রুরা অনুরোধ করলেন অরেকটু বসার। উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় অনেকের সঙ্গে কথা হলো। ফ্লাইট দেরি বলে যেমন বিরক্তি আছে আবার দেশে ফিরে আনন্দের কথাও জানালেন। জানালেন ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে দুবাইয়ের বদলে যাওয়া পরিস্থিতি আর আতঙ্কের কথাও। 

এদেরই একজন মোহাম্মদ ইয়াসিন। বাড়ি কুমিল্লায়। চোখেমুখে ভীষণ ক্লান্তি। ৮ নম্বর কাউন্টারে লাগেজ নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কথা বলতে বলতে জানালেন, ছয় বছর পর দেশে এলেন। দুবাইয়ের পরিস্থিতি কেমন জানতে চাইলে বললেন, ভালো মন্দ দুটোই আছে। তবে দুবাই বেশিরভাগ মিসাইল তাদের মাটিতে পড়তে দিচ্ছে না এটা ভালো দিক। 

প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘দুশ্চিন্তা তো আছে। তবে দুবাই থাকা মানুষের মধ্যে এমন আতঙ্ক আগে দেখিনি।’
 
মইনুল হোসেন নামে এক প্রবাসী জানালেন, যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশিরা যতটা ভয় পেয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার লোকজন তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পেয়েছে। তারা সবাই দুবাই ছাড়ছে। এমন আতঙ্ক দুবাইতে আগে দেখা যায়নি। বাংলাদেশিরা সেই তুলনায় কম ভয় পাচ্ছেন। তাদের মধ্যে বরং যুদ্ধ নিয়ে নানা গল্প আছে। 

গল্প যে আছে তা কিছুক্ষণ থেকেই বোঝা গেল! দুবাই কীভাবে ইরানের অধিকাংশ মিসাইল মাটিতে পড়তে দিচ্ছে না তা নিয়ে নানা গল্প জুড়ে দিলেন তারা। কয়েকজন প্রবাসীকে পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করলে তারা বললেন, ‘ভিডিও দিয়েন না কোথাও। আরব দেশগুলোতে যুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে মানা। বিশেষ করে ফেসবুকে।’ 

তারা জানালেন, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব প্রবাসীদের বলা হয়েছে তারা যেন যুদ্ধ নিয়ে ফেসবুকে বা অন্য কোথাও কিছু যেন না বলেন। কোন কিছুর ছবি যেন না দেন। বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি এসব কারণে গ্রেপ্তার হয়েছে এমন কথাও তারা বললেন।

একই ফ্লাইটে স্ত্রী ও শিশু কন্যাকে নিয়ে এসেছেন আরেক প্রবাসী। নাম জানালেন সুলতানুল ইসলাম। তিনি বললেন, একটা জিনিস ভালো কোনো ধরনের বিপদের আশঙ্কা থাকলে সবাইকে জানানো হতো যেন সকলে সতর্ক থাকেন। 

৮ নম্বর বেল্টের পাশেই সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে আসা যাত্রীরা লাগেজ নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। রাত তখন সোয়া ১২টা? কেমন আছেন আপনারা জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন বিরক্ত হয়ে বললেন, লাগেজ কখন আসবে? এয়ারপোর্টে এসি কেন কাজ করে না? ঢাকা বিমানবন্দরের অবস্থা কেন আরও ভালো হয় না? এতো মশা কেন?
 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সৌদি আরবের পরিস্থিতি কেমন জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন জানালেন, জেদ্দায় সেভাবে আতঙ্ক নেই। তবে রিয়াদ আর দাম্মামে কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর কথাও তারা জানালেন। তবে যুদ্ধ নিয়ে যতটা ভয়ের কথা বললেন তার চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তা দেখা গেল ভবিষ্যতের জীবন-জীবিকা নিয়ে।
  
অবশ্য এই দুশ্চিন্তা না হওয়ারও কোনো কারণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কম-বেশি ৫০ লাখ বাংলাদেশি থাকেন। সেখান থেকে কষ্ট করে তারা ‘প্রবাসী আয়’ পাঠান দেশে। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যে সংকট মানে তাদেরও সংকট। যারা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন সেই বাংলাদেশিরা যেমন দুশ্চিন্তায় আছেন তার চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন যারা যেতে পারছেন না।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধের কারণে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত সব মিলিয়ে বাতিল হওয়া ফ্লাইট সংখ্যা ৪৪৭টি। ফলে অসংখ্য বিদেশগামী যারা ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করেও বিদেশে যেতেন পারেননি। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া থেকে শুরু করে আদৌ তারা কবে কখন যেতে পারবেন তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন।
 
বাংলাদেশ থেকে গত কয়েক বছরে গড়ে ১০ থেকে ১১ লাখ লোক, অর্থাৎ মাসে লাখ-খানেক লোক বিদেশে যাচ্ছেন যাদের মূলত গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান ও লেবানন। ইরান–ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ ছড়িয়েছে তাতে এই শ্রমবাজারগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে, ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।  প্রবাসী আয় থেকে শুরু করে বহুখাতে এর প্রভাব পড়বে। 

প্রথমত, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন শ্রমিক পাঠানো বাধাগ্রস্ত। নতুন করে যারা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের যাত্রা বিলম্বিত বা অনিশ্চিত। ছুটিতে যারা দেশে আছেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই কর্মস্থলে ফেরত যাওয়ার বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইরানে যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিলের ফলে যেসব প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের সাহায্য করতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি হটলাইন চালু করেছে।
 
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে জ্বালানি, নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এসব প্রকল্প স্থগিত বা ধীরগতির হতে পারে। বিশেষ করে নির্মাণ খাত—যেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন—সেখানে নতুন নিয়োগ কমে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের হার কমতে পারে। আবার অনেক কর্মী ফেরতও আসতে পরে। ফলে সরকারের এখন থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সব সংস্থাকে নিয়ে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত। 

কোনো সন্দেহ নেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালেও ৩০ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা যার বেশিরভাগই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান বা আয় যদি আসলেই কমে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যক্তি, পরিবার থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি এমনকি রিজার্ভেও। আবার অতীতে দেখা গেছে সংকটের সময় প্রবাসীরা স্বজনদের কাছে অনেক বেশি টাকা পাঠায়। কাজেই প্রবাসী আয়ে হয়তো এখুনি ঝুঁকি নাও পড়তে পারে বিশেষ করে ঈদের মাসে।
 
এই যুদ্ধে সংকটের পাশাপাশি সম্ভাবনাও দেখা যেতে পারে। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন করে অনেক কর্মীর প্রয়োজনও হতে পারে সবকিছু স্বাভাবিক করতে। বিশেষ করে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন বা নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে কর্মীর চাহিদা আবার বাড়বে। তবে বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক যে শ্রমবাজার সেখান থেকে বেরিয়ে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা জরুরি। এক্ষেত্রে ইউরোপ কিংবা জাপানে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বাজারগুলো ধরতে হলে দক্ষতার বিকল্প নেই।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি নিরাপদ থাকা। ইরানের হামলায় ইতোমধ্যেই সৌদি আরবে দুজন এবং বাহরাইন ও সংযুক্ত আরবে একজন করে মোট চারজন বাংলাদেশি নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। কাজেই প্রবাসীদের সতর্ক থাকতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অতি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের না হওয়ার জন্য প্রবাসীদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধের কোনো ছবি বা ভিডিও আপলোড করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত।

রাত সাড়ে ১২টায় এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে রাতের ঢাকা থেকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এই যে আলো ঝলমলে ঢাকা, এই যে বাংলাদেশের উন্নয়ন তার পেছনে প্রবাসীদের তো বিশাল অবদান। কিন্তু প্রবাসী আয় আর রিজার্ভ নিয়ে যতোটা কথা হয় নেপথ্যে থাকা কোটি প্রবাসীর জীবন, উদ্বেগ, আশা-হতাশা, তাদের মানবিক গল্পগুলো নিয়ে কতোটা ভাবে এই রাষ্ট্র? যে প্রবাসীরা রাষ্ট্রকে এতোটা দিচ্ছেন তাদের কতোটা দিচ্ছে রাষ্ট্র? বিশেষ করে সংকটে হোক সেটা করোনা মহামারি কিংবা যুদ্ধ?

ভাবতে ভাবতে কামনা করছিলাম অশান্তির এই যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হোক! ভোর আসুক। ততদিন ভালো থাকুক কোটি প্রবাসী, অনেক দূরে থেকেও বুকের ভেতরে যাদের অতি যত্নে থাকে বাংলাদেশ! 

শরিফুল হাসান, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যাণ্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম)।

আরও পড়ুন

×