ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও বৈষম্যের বিশ্ব

পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও বৈষম্যের বিশ্ব
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কথাটা পুরাতন, বহুবার বলা হয়েছে, একঘেয়ে শোনাবে, তবু বলতে হয়। সেটা হলো, পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক ও শোষিত। এটা অনেক আগে থেকেই সত্য, এখন, পুঁজিবাদ যখন উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে, তখন সেটা আগের যে কোনো সময়ের চাইতে অধিক সত্য। শোষিতের সংখ্যা অনেক বেশি, শোষণকারীদের তুলনায়। শোষিতদের প্রধান দুর্বলতা তাদের বিচ্ছিন্নতা। তারা ঐক্যবদ্ধ নন। শোষকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা আছে। ইলন মাস্ক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প হরিহর আত্মা হয়েছিলেন, পরে তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, ট্রাম্পের নির্বাচনের সময় ইলন মাস্ক সর্বক্ষণ ও সর্বপ্রকারে ট্রাম্পের পাশেই ছিলেন; বিজয় শেষে ইলন এখন এমন পর্যন্ত বলেছেন যে ট্রাম্প হচ্ছেন ওয়াশিংটনের সর্বাধিক পরিচিত অপরাধী। তাই বলে নির্বাচনের সময়ে তাদের বন্ধুত্বটা তো মিথ্যা ছিল না। যার অর্থ তারা একাট্টা তাদের শত্রুপক্ষকে অর্থাৎ জনগণকে শাসন-শোষণ করবার ব্যাপারে, আবার একে অপরের শত্রু স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

অপরদিকে শোষিত মানুষের শক্তিও থাকে তাদের নিজেদের ঐক্যেই–নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে যেটা প্রমাণিত হলো। পুঁজিপন্থি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এবং পরাভূত করে মামদানির বিজয় এটাও জানিয়ে দিল যে সমাজতন্ত্রীরা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবেন তখনই যখন তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবেন যে তারা অন্য কিছু নন, সমাজতন্ত্রী ভিন্ন। লুকোছাপা করলে বা অর্ধেকটা বলে বাকিটা আড়াল করে রাখলে তারা হেরে যাবেন, নিজের কাছে তো বটেই, জনমানুষের কাছেও। মানুষ পরিবর্তন চায়। পুঁজিবাদকে তাদের চেনা ও জানা হয়ে গেছে, এ ব্যবস্থাকে তারা যে মেনে নেন, সেটা নিতান্ত বাধ্য হয়েই, এবং বিকল্পের সন্ধান পান না বলেই। বিপন্ন মানুষের জন্য সামাজিক মালিকানার পক্ষে না দাঁড়াবার কোনো কারণই নেই, যদি সেভাবে ব্যাপারটা তাদের বোঝানো যায়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সাংস্কৃতিক তৎপরতা, যেটা এখন নেই। 

ইলন মাস্কের প্রসঙ্গ ইতোমধ্যেই এসে গেছে। বর্তমানে বিশ্বের সেরা এই ধনী নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে যে বেতন গ্রহণে সম্মত হয়েছেন, তা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এঁর বিশেষ আগ্রহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়। ওই খাতে তিনি প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যেই যে মাত্রার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তাতে বিশ্ববাসী রীতিমতো হতভম্ব। তবে এর পেছনে যে শঙ্কা বিরাজমান, তার কথাও শোনা যায়। কিন্তু তেমনভাবে নয়, যেমনভাবে শোনা দরকার। প্রথম প্রশ্ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মালিক কারা হবেন? মালিক তো হবেন ইলন মাস্কের মতো কয়েকজনই। ওই উদ্ভাবনীকে তারা ব্যবহার করবেন ‘উন্নয়নে’র স্বার্থে। যে উন্নয়ন বৈষম্য বাড়াচ্ছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে এবং প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতা করে প্রকৃতিকে প্রতিশোধ নিতে প্ররোচিত করে চলেছে। এক কথায় গণহত্যা ঘটাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দ্বিতীয় শঙ্কাটি আরও ভয়াবহ। সেটি হলো লাখ লাখ মানুষকে বেকার করা, এবং যারা কর্মে নিযুক্ত থাকবে তাদের সৃষ্টি শক্তিবিহীন প্রাণীতে পরিণত করা, এবং মানবজাতিকে শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের শাসনাধীন করে ফেলা। আশা করি এমনটা ঘটবে না, কিন্তু তেমন ঘটনাকে প্রতিহত করার জন্য যা আবশ্যক তা হলো মূল যে শত্রু, পুঁজিবাদী উন্নয়ন, তাকে বিদায় করে দেওয়া। 

বিরামহীন তৎপরতায় পুঁজিবাদীরা বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়াশীলতাকে উৎসাহিত করে চলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ঘোরতর প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিরা এখন বিশ্বের হর্তা-কর্তা-বিধাতা হয়ে পড়েছেন। জনতুষ্টির রাস্তা ধরে এগিয়ে এবং উগ্র বিভ্রান্তিকর উত্তেজক শত বক্তব্য দিয়ে জনতার সমর্থন নিয়েই এরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ট্রাম্পরা হচ্ছেন–বাংলা প্রবচনে যেমনটা বলা আছে–‘জাতে মাতাল তালে ঠিক’। ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার বড় করবার তাল তুলছেন। শুল্কবৃদ্ধি ও অভিবাসী বিতাড়নের কর্মসূচি নিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে মার্কিনিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপরতা শুরু করেছেন; ইসরায়েলকে সঙ্গী করে ইরান আক্রমণের পেছনে ইরানের তেলসম্পদ দখল, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। তবে পারস্য জাতীয়তাবাদের মরণ ছোবলে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর চরম দুরবস্থার সংবাদ গণমাধ্যমে শোনা যাচ্ছে। সমস্ত কিছুর অন্তরালের অভিসন্ধি কিন্তু একটাই, নিজেকে বড় করা। ব্যতিক্রমবিহীনভাবে সকল পুঁজিবাদীই ওই কাজে নিয়োজিত। ইহজাগতিক পুঁজিপন্থিদের মতোই ধর্ম ব্যবসায়ীরাও একই কর্মে দীক্ষিত। 

নিরাশ্রয় মানুষ ধর্মের কাছে আশ্রয় খোঁজে; ধর্ম ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগটা লুফে নেয়। তা ছাড়া বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থার নিপীড়নে অস্থির হয়ে মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হচ্ছে সামাজিক মালিকানা অর্থাৎ সমাজতন্ত্র। সে-ব্যবস্থার প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, সমাজ-পরিবর্তনের আন্দোলনের ওপর নিষ্পেষণ চলে, এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজবিপ্লবীদের নিজেদের ভেতর অনৈক্য ও বিভ্রান্তি। ফলে প্রতিক্রিয়াশীলতার এখন বাড়-বাড়ন্ত। বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়াশীলতার জোয়ার তৈরির লক্ষণ বিলক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যেমন বেগম রোকেয়াকে মুরতাদ কাফির আখ্যা দেওয়া। ঘটনাটা ঘটেছে গত ৯ ডিসেম্বরে, যে তারিখটি রোকেয়ার জন্মদিবস আবার মৃত্যুদিবসও। কাজটা করেছেন অন্য কেউ নন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এক সহযোগী অধ্যাপক। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন যে মতামতটি ওই অধ্যাপকের নিজস্ব। সেটা আমরা যে জানি না তা তো নয়; কিন্তু এই রকমের বিষাক্ত মতাদর্শ নিয়ে একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন কীভাবে, সে-প্রশ্ন তো রয়েই যায়। আরও বড় প্রশ্ন, ওই রকমের একটা সংক্রামক ব্যাধিকে নিজের মধ্যে ধরে না-রেখে সেটিকে এভাবে অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত করে দেবার অধিকার তিনি রাখেন কি? সে-অধিকার তাঁকে কে দিল? বিশ্ববিদ্যালয় যে চলে পাবলিকের টাকায়, সে সত্যটাও ভুলে গেলে চলবে না।

শিক্ষকদের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল তখন এটা স্মরণ করা যাক যে শিক্ষার মান অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকদের মানের ওপর; এবং শিক্ষকদের মান নির্ভর করে তারা বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা কতটা পাচ্ছেন তার ওপর। মেধাবান মানুষরা শিক্ষক হিসেবে অবশ্যই আসবেন যদি দেখা যায় যে পেশাগত বেতন-ভাতা এবং সামাজিক মান-সম্মান আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এবং যদি এমন হয় যে শিক্ষক হবার জন্য তদবির করা ও উৎকোচ প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিলুপ্তি ঘটেছে। এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়বে যদি যথার্থ ও নিয়মিত শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×