ধর্ষণ প্রতিরোধে সামষ্টিক সচেতনতা ও আইনি বাস্তবায়ন জরুরি
প্রতীকী ছবি
মো. শফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৪৫
সম্প্রতি ধর্ষণের ভয়াবহ ঘটনা আবারও আমাদের সামনে এসেছে। নরসিংদিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আরও একবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন নিয়ে কোনোরকম ছাড় দেয়া যাবে না। সেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার পর অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যা আরও বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর ঐ কিশোরীকে হত্যা করে।
শিশুদের প্রতি সহিংসতা আমাদের সমাজে দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যার ঘটনায় মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় স্পষ্ট হয়েছে। আর যশোরে একটি শিশুকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকের ইঙ্গিত দেয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অতীতেও কুমিল্লার দেবিদ্বারে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল এবং তার শিক্ষকই এই জঘন্য অপরাধের জন্য দায়ী। ঐ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছিল এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে, এটি শুধুমাত্র একটির উদাহরণ মাত্র, আমাদের সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধের পরিমাণ এবং তার সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।
তবে ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আশার সঞ্চার করেছিল। সেখানে এক ছাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে একজন অধ্যাপককে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে সাময়িক অপসারণের পর স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হয়। এই পদক্ষেপটি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়, কারণ এটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত এবং সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার একটি উদাহরণ। এই ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপই সমাজে ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং অন্যান্য সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৪ সালে ৪০১ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন এবং ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ১০৯টি ঘটনায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে ২০২৪ সালে যৌন সহিংসতার মধ্যে ২৮১ জন নারী ও ৩৩১ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মোট ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনা মিলিয়ে ২০২৪ সালে সাধারণভাবে সহিংসতার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়েছে।
২০২৫ সালের ধর্ষণ পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রথম ৬ মাসে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৩৫৪ থেকে বেড়ে ৪৮১টি হয়েছে, যা ২০২৪ সালের মোটের প্রায় কাছাকাছি বা তা ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষা দেখা গেছে। শিশু ধর্ষণের সংখ্যা প্রথম ৭ মাসে প্রায় ৩০৬টি, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার রিপোর্টে দেখা গেছে, ধর্ষণের পর হত্যা বা প্রচণ্ড সহিংসতার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে, ধর্ষণের চেষ্টা ও দলগঠিত ধর্ষণের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় বেশি। বিশেষভাবে কন্যাশিশুসহ নারীদের উপর নির্যাতনের ঘটনা ২০২৫ সালে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং অধিকাংশ ভুক্তভোগী কন্যাশিশু হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে। এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি বড় ধরনের সংকেত যে আমাদের সমাজে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটছে? কেন বিচারহীনতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা এমন অপরাধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? যখনই এই ধরনের অপরাধ ঘটে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের এবং সমাজের কাছ থেকে সঠিক বিচার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু যদি সেই বিচার না হয়, তবে অপরাধীরা আরও বেশি সাহসী হয়ে ওঠে এবং তাদের কার্যকলাপ আরও মারাত্মক হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের আইনব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় এবং কার্যকর করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ধর্ষণের বিচার থেকে রেহাই না পায়। ধর্ষণের মতো অপরাধ দমন না হলে নারী সমাজ কখনোই নিরাপদ বোধ করবে না এবং সমাজের প্রগতিও থেমে যাবে।
দেশে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের বৃদ্ধি একটি বহুস্তরীয় সমস্যা, যার মধ্যে রয়েছে যৌন হতাশা, পুরুষতন্ত্রের প্রবল প্রতিরোধ, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক অবহেলা, এবং আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা। এইসব বিষয়গুলি একত্রে ধর্ষণের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, এটি শুধুমাত্র আইনগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা, যা সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্বশীলতা এবং সচেতনতায় সমাধান হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং নীতিশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, এবং আইন প্রয়োগে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া সমাজে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন রোধে একযোগে কাজ করা জরুরি। এটি এককভাবে সম্ভব নয়, সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে, ধর্ষণের শিকার হওয়া কোনো নারী বা শিশু কখনোই বিচারের বাইরে যাবে না। ধর্ষণ বন্ধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের সচেতনতা এবং সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে শুধু আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিকভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
- বিষয় :
- ধর্ষণ
- ধর্ষণ প্রতিরোধ
