ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্ব আবহাওয়া দিবস

জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রয়োজন টেকসই প্রস্তুতি

জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রয়োজন টেকসই প্রস্তুতি
×

মোহন কুমার দাশ

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ | ২২:৪৯

প্রতিবছর ২৩ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এই প্রতিষ্ঠালগ্নটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের এক স্মারক। ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য “আজকের পর্যবেক্ষণ, আগামী দিনের সুরক্ষা” আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ডব্লিউএমও-র মহাসচিব ড. সেলেস্টে সাউলোর ভাষায়, "আগাম সতর্কতা কেবল জীবন বাঁচায় না, এটি জীবিকারও রক্ষাকবচ।" কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের বর্তমান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কি সেই সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট?

গত কয়েক বছরের আবহাওয়াচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই ১.১ থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০২৩ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর, আর ২০২৬ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। চুয়াডাঙ্গার তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের নজিরবিহীন বন্যা এ সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে গেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৫ কোটি মানুষ আজ অস্তিত্বের সংকটে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ১০ লাখ হেক্টর কৃষিজমি উর্বরতা হারিয়েছে। এর অর্থ হলো, কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাও এখন খাদের কিনারায়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বঙ্গোপসাগর। এখানকার উষ্ণ জলভাগে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে শক্তি সঞ্চয় করে । অনেক সময় হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় থাকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য। আমাদের স্থলভিত্তিক রাডারগুলো যখন সংকেত পায়, ততক্ষণে দুর্যোগ দোরগোড়ায়। এ ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে পর্যাপ্ত ‘ওশান বয়া’ বা স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা আমাদের বড় এক দুর্বলতা। সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রাপ্ত রিয়েল-টাইম তথ্য ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত শক্তি পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব। তাই ‘আজকের পর্যবেক্ষণ’ বলতে আমাদের সমুদ্রতলের ডেটা কালেকশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করাকেই বুঝতে হবে।

এখন মানুষের প্রশ্ন কেবল ‘বৃষ্টি হবে কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো ‘এই বৃষ্টিতে আমার এলাকা ডুববে কি না?’ এখানেই আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের সার্থকতা। স্যাটেলাইট ও ডপলার রাডারের তথ্যের পাশাপাশি এখন ‘ইমপ্যাক্ট-বেসড ফোরকাস্টিং’ বা প্রভাবভিত্তিক পূর্বাভাস জরুরি। অর্থাৎ, আবহাওয়ার তথ্যের সঙ্গে ভৌগোলিক উপাত্ত (GIS) মিলিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা যে, কোন রাস্তায় জলাবদ্ধতা হবে বা কোন ফসলের ক্ষতি হবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার কমেছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সূচক বেড়েই চলেছে। এই ক্ষতি কমাতে হলে আমাদের তথ্যের গভীরতা বাড়াতে হবে।
আবহাওয়া কোনো রাজনৈতিক সীমানা বা কাঁটাতার মানে না। হিমালয়ের পাদদেশে বৃষ্টি হলে তার ফল ভোগ করতে হয় বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলকে। হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা মোকাবিলায় উজানের দেশের (যেমন ভারত বা নেপাল) রিয়েল-টাইম রেইনফল ও রিভার ফ্লো ডেটা অপরিহার্য। ডব্লিউএমও-র ‘ইউনিফাইড ডেটা পলিসি’ অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবাধ তথ্য বিনিময়ের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় কারিগরি বা রাজনৈতিক কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়। সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র (SMRC) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিমসটেক (BIMSTEC) বা হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে।

১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী দুর্যোগে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার একটি বিশাল অংশ দক্ষিণ এশিয়ায়। এশিয়ায় এই সময়ে ৩৬১২টি দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৯ লক্ষ ৮৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ঘূর্ণিঝড় নার্গিস একাই কেড়ে নিয়েছিল ১ লক্ষ ৩৮ হাজার প্রাণ। ভয়াবহ তথ্য হলো, এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে মারা গেছে প্রায় ৫ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ, যা এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ‘রোল মডেল’, কিন্তু এই পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

কেবল যান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ দিয়ে সুরক্ষা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন বা উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী হলো আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল। একটি ম্যানগ্রোভ গাছ ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ যতটা কমাতে পারে, কোনো কংক্রিটের বাঁধ তা পারে না। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলে আমাদের এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। তাই ‘সুরক্ষা’র সংজ্ঞায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণকেও যুক্ত করতে হবে।

বর্তমান সময়ের তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাদের এই উদ্যমকে গবেষণার মূল ধারায় যুক্ত করা প্রয়োজন। ‘সিটিজেন সায়েন্স’ বা জন-অংশগ্রহণমূলক তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষ যদি তাদের এলাকার তাৎক্ষণিক আবহাওয়ার তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করে, তবে তা কেন্দ্রীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল করতে সাহায্য করবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে জোর দিতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া কোনো ‘ব্যয়’ নয়, বরং এটি একটি ‘স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট’। ডব্লিউএমও এবং বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকর সতর্কবার্তা দিতে পারলে বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদহানি রোধ করা সম্ভব। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

জলবায়ু সংকট আমাদের সবার। সমাধানও আসতে হবে সম্মিলিতভাবে। বিশ্ব আবহাওয়া দিবস ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমরা যদি আজ প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ না করি এবং তাকে সংরক্ষণ না করি, তবে আগামী দিনের সুরক্ষা কেবল একটি স্বপ্নই রয়ে যাবে। এখনই সময় প্রস্তুতির; আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবী।

ড. মোহন কুমার দাশ : যুগ্ম সচিব, সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (সামা) এবং নির্বাহী পরিচালক, হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টার
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×