সমাজ
একা মরে পড়ে থাকেন মা, আমরা কোথায় আছি?
এই বাড়ির চতুর্থ তলায় পড়ে ছিল বৃদ্ধার গলিত মরদেহ -সমকাল
মো. আবু নাসের
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ১৩:১২
পল্লবীর চারতলা ভবনের ছোট্ট একটি কক্ষে মরে পড়েছিলেন একজন মা। নাম নূরজাহান বেগম। বয়স আনুমানিক পঁচাত্তর। তাঁর একটু দূরে, একই শহরে, হয়তো মাত্র কয়েক মাইলের ব্যবধানে, বাস করতেন তাঁর দুই ছেলে। একজন বুয়েটের শিক্ষক; প্রকৌশলের জ্ঞান বিতরণ করেন প্রতিদিন। অন্যজন যুগ্ম সচিব, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে অংশ নেন। তাঁদের জামাতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই পরিবারের শিক্ষা-দীক্ষা, পদমর্যাদা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশেপাশের মানুষ গর্ব করতেন, হয়তো ঈর্ষাও করতেন।
কিন্তু সেই গর্বিত পরিবারের বৃদ্ধা মা, যিনি একদিন এই ছেলেদের বুকে আঁকড়ে রাতের পর রাত জেগে কাটিয়েছেন, তিনি মরে পড়ে রইলেন একা, নিঃসঙ্গ, অন্ধকারে। কেউ জানল না। শেষ পর্যন্ত মায়ের লাশ উদ্ধারের খবর পেয়েও যুগ্ম সচিব পুত্রটি আসেননি।
ঠিক কতদিন ধরে নূরজাহান বেগম মৃত ছিলেন, তা হয়তো তদন্তে জানা যাবে। কিন্তু তারও আগে জানা গেছে ভয়ংকর একটি সত্য। তিনি এতটাই একা ছিলেন যে তিনি কখন মারা গেলেন তা কেউ টেরই পায়নি। একজন মানুষ জীবনের শেষ মুহূর্তে কতটা নিঃসঙ্গ হলে এমন পরিণতি তার জন্য অপেক্ষা করতে পারে?
আমরা সবাই একদিন মরব। মৃত্যুর মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের একটি ন্যূনতম আকাঙ্ক্ষা থাকে। মৃত্যুর সময় পাশে হয়তো কোনো প্রিয়জন থাকবে। কেউ তার হাত ধরে বসে থাকবে। কেউ তার কপালে হাত রাখবে। কেউ বলবে, ‘মা, আমি আছি।’ নূরজাহান বেগম সেই সামান্য সৌভাগ্যটুকুও পাননি।
এই দেশের লাখো মা-বাবার মতো নূরজাহান বেগমও হয়তো জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রামে। হয়তো নিজের শখ বিসর্জন দিয়েছেন। হয়তো নতুন শাড়ি কেনেননি, যাতে ছেলের বই কেনা যায়। হয়তো নিজের চিকিৎসা পিছিয়েছেন, যাতে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ না হয়। হয়তো প্রতিটি ঈদে নিজের চাওয়ার আগে সন্তানের চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের মায়েরা এমনই হন। তারা নিজেদের জীবনকে ধীরে ধীরে সন্তানের জীবনের ভেতরে বিলীন করে দেন। তারপর একদিন দেখা যায়, সেই সন্তানদের জীবন এত ব্যস্ত হয়ে গেছে যে সেখানে মায়ের জন্য আর জায়গা নেই।
কী ভয়ংকর এই পরিহাস। একদিন যে মায়ের পৃথিবী ছিলো সন্তান, একসময় সেই মা সন্তানের পৃথিবীর প্রান্তে ঠেলে দেওয়া একটি নাম হয়ে যান। মাঝে মাঝে ফোন করা হয়। কোনো উৎসবে দেখা করা হয়। খরচ পাঠানো হয়। দায়িত্ব পালন করা হয়। কিন্তু ভালোবাসা আর দায়িত্ব এক জিনিস নয়। একজন বৃদ্ধ মানুষের প্রয়োজন কেবল ওষুধ নয়। কেবল খাবার নয়। তার প্রয়োজন মানুষের কণ্ঠস্বর। তার প্রয়োজন কারও প্রশ্ন, ‘মা, আজ কেমন আছো?’ তার প্রয়োজন এই অনুভূতি যে তিনি এখনও কারও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই মনে করি, টাকা পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। সুন্দর একটি ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করলেই কর্তব্য সম্পন্ন। কিন্তু মানুষ তো আসবাবপত্র নয়। মানুষকে শুধু আশ্রয় দিলেই হয় না, তাকে সঙ্গও দিতে হয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে মানুষ মহাকাশে যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে, কোটি কোটি টাকা আয় করছে। কিন্তু নিজের মায়ের নিঃসঙ্গতা বোঝার সময় পাচ্ছে না। এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা। আমরা সন্তানদের সফল হতে শেখাই, কিন্তু কৃতজ্ঞ হতে শেখাই না। আমরা তাদের প্রতিযোগিতা শেখাই, কিন্তু মমতা শেখাই না। আমরা তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে বলি, কিন্তু মানবিক হতে বলি না। ফলে আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু সবসময় ভালো মানুষ তৈরি করতে পারছি না।
আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। উচ্চশিক্ষা মানুষকে উদার করে। জ্ঞান মানুষকে মানবিক করে। কিন্তু পল্লবীর এই ফ্ল্যাট আমাদের একটি নিষ্ঠুর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ডিগ্রি কি সত্যিই মানুষকে মানুষ বানায়? যে শিক্ষা একজন মানুষকে মায়ের নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে শেখায় না, সেই শিক্ষা আসলে কী শিক্ষা? যে জ্ঞান একজন মানুষকে গবেষণাপত্র লিখতে শেখায়, কিন্তু বৃদ্ধ মায়ের খোঁজ নিতে শেখায় না, সেই জ্ঞানের সামাজিক মূল্য কতটুকু? যে প্রশাসনিক ক্ষমতা একজন কর্মকর্তাকে হাজারো মানুষের ভাগ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা দেয়, কিন্তু নিজের মায়ের জীবন ও মৃত্যুর প্রতি ন্যূনতম দায়বোধ তৈরি করে না, সেই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? আমরা প্রায়ই ধরে নিই, শিক্ষিত মানুষ মানেই ভালো মানুষ। বাস্তবতা বারবার দেখিয়েছে, এই দুই জিনিস এক নয়।
পল্লবীর সেই ফ্ল্যাটে যে লাশটি পড়ে ছিল, সেটি কেবল একজন বৃদ্ধা নারীর দেহ নয়। সেটি আমাদের সামাজিক বিবেকের লাশও। সেখানে পড়ে ছিল আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের আসল চেহারা। সেখানে পড়ে ছিল সেই সব বড় বড় বক্তৃতার অসারতা, যেখানে আমরা পরিবার, সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলি। কারণ কোনো সমাজের মানবিকতা পরিমাপ করা হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে। আর একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা মা সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের একজন।
আমরা প্রায়ই ভাবি, বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে রাখা গরিব মানুষের সমস্যা। গরিব মানুষ দুবেলা পেটের চিন্তায় পারেন না, বুঝলাম। কিন্তু এই বৃদ্ধা কোনো ফুটপাতে পড়ে ছিলেন না। তিনি কোনো অজ্ঞাতপরিচয় নারী ছিলেন না। তিনি এমন একটি পরিবারের সদস্য, যার সঙ্গে রাষ্ট্রের উচ্চপদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এবং সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের কি সামর্থ্যের অভাব ছিলো? নাকি ইচ্ছার অভাব?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃদ্ধ মানুষের একাকীত্বকে এখন "নীরব মহামারি" বলা হচ্ছে। জাপান, যুক্তরাজ্য কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একা মরে পড়ে থাকা বৃদ্ধদের ঘটনা সমাজবিজ্ঞানীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সেসব দেশে রাষ্ট্র উদ্যোগী হচ্ছে, মন্ত্রণালয় তৈরি হচ্ছে একাকীত্ব মোকাবেলার জন্য। আর আমরা এখনও স্বীকারই করিনি যে সমস্যাটি আছে।
আমাদের শহুরে সমাজে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হচ্ছে। অণু পরিবারের ধারণা আমদানি হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে যে প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা থাকা দরকার ছিল, তা আমরা গড়ে তুলিনি। ফলে পুরনো বন্ধন ছিঁড়ে গেছে, নতুন কাঠামো তৈরি হয়নি। মাঝখানে পড়ে আছেন নূরজাহান বেগমের মতো হাজার হাজার বৃদ্ধ মানুষ।
মা মারা গেছেন, কিন্তু যুগ্ম সচিব পুত্র এলেন না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কী ছিল? ব্যস্ততা? অভিমান? দীর্ঘদিনের সম্পর্কহীনতার জড়তা? নাকি নির্লিপ্ততা? যে কারণই হোক, এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা, ব্যক্তির এবং পরোক্ষভাবে আমাদের সমাজেরও। কারণ সমাজ এই মানুষটিকে "সফল" মানুষ হিসেবে চেনে। তাঁর পদমর্যাদা, তাঁর পরিচয়, এসব নিয়ে আমরা গর্বিত হই। কিন্তু মায়ের লাশের পাশে না দাঁড়ানো মানুষটিকে আমরা জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাই না। সমাজ তাঁকে ক্ষমা করে দেয়, কারণ তিনি ‘বড় মানুষ’।
শুধু সন্তানদের দোষ দিলেই দায় শেষ হয় না। রাষ্ট্রেরও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া জরুরি। বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বয়স্ক ভাতা আছে, কিন্তু তা প্রতীকী। বৃদ্ধদের জন্য সামাজিক সেবা কাঠামো প্রায় অনুপস্থিত। কোনো কমিউনিটি কেয়ার সিস্টেম নেই যা নিয়মিত একাকী বৃদ্ধদের খোঁজখবর রাখবে।
এই ঘটনার আরো একটি শিক্ষা আছে, যা হয়তো অনেক বাবা-মায়ের জন্য অস্বস্তিকর। আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন, সন্তানই তাদের বার্ধক্যের বীমা। সন্তানদের মানুষ করা, প্রতিষ্ঠিত করা এবং তাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিহিত আছে। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমশ ভিন্ন কিছু বলছে। আধুনিক পৃথিবীতে বাবা-মায়ের উচিত নিজেদের বার্ধক্যের আর্থিক নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করা। কর্মজীবনের সময় সঞ্চয় করতে হবে। পেনশন, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যবীমা এবং অবসর-পরবর্তী জীবনের পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ বার্ধক্যে সম্মান নিয়ে বাঁচতে হলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নূরজাহান বেগম আর নেই। তাঁর কষ্ট, তাঁর অপেক্ষা, তাঁর একাকীত্বের কথা আর কখনো জানা যাবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে ঢাকা শহরে, সারা দেশে, হাজারো নূরজাহান বেগম আছেন। কেউ পুরনো বাড়িতে একা, কেউ ছেলের ফ্ল্যাটের একটি কোণে নিঃসঙ্গ, কেউ মেয়ের বাসায় বোঝা হয়ে বসে আছেন। তাঁরা কারো কাছে কিছু চান না। শুধু একটু উপস্থিতি চান। একটু স্পর্শ চান। একটু "মা, কেমন আছ?" শুনতে চান। সেটুকু কি আমরা দিতে পারব না?
ড. মো: আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন
