নগর পরিকল্পনা
বগুড়ার বর্তমান অব্যবস্থাপনাই ভবিষ্যতের নিয়তি?
বগুড়ার পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রান্তের বাইপাসের মধ্যে ৭/৮ কিলোমিটার রেললাইনের লেভেল ক্রসিং (ক্রস চিহ্নিত)
ফয়সাল কবীর শুভ
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচনের আগে বগুড়ার আলতাফুন্নেসা মাঠের জনসভায় বিএনপির চেয়ারপারসন (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান বলেছিলেন, গত বিএনপি সরকারের সময়ে বগুড়া ঘিরে তাঁর পরিকল্পনায় একটি মডেল জেলা শহর বানানোর স্বপ্ন ছিল। যে শহর দেখে অন্য জেলা শহরগুলো অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু তাঁর সেই পরিকল্পনা আর সামনের দিকে এগোতে পারেনি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে। যা হোক, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বগুড়া আবারও উন্নয়ন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। শিগগিরই বাংলাদেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বগুড়া পৌরসভা।
বগুড়ার বর্তমান বাস্তবতা হলো, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা একত্রে জটিল যানজট পরিস্থিতি তৈরি করেছে। স্থানীয় পত্রিকার হিসাবে বগুড়া পৌরসভার ভেতরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় আট হাজার মানুষ বসবাস করছে। ইতোমধ্যে শহরের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিপরীতে নেই কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান। ফলে রাস্তা, পার্কিং, গণপরিবহন– সব কিছুই চাপের মুখে। বগুড়া শহরের যানজট সমস্যা এখন আর শুধু একটি দৈনন্দিন ভোগান্তির বিষয় নয়। এটি শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি কাঠামোগত সংকট। নতুন সিটি করপোরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রাক্কালে এ সমস্যার সমাধান না করলে বগুড়া অচল নগরে পরিণত হতে পারে।
যানজট সমস্যার মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একক কোনো কারণে হয়নি। বরং একাধিক আন্তঃসম্পর্কিত সমস্যার ফল। শহরের ভেতর দিয়ে চলমান রেললাইন এবং অসংখ্য রেলক্রসিং নিয়মিত যান চলাচল বন্ধ করে দেয়, যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে দীর্ঘস্থায়ী জট তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ড, রাস্তার ধারে অবৈধ স্থাপনা, ভাসমান হকার এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা। একই সঙ্গে পার্কিং ব্যবস্থার ঘাটতি এবং মানসম্মত ফুটপাতের অভাব শহরের সড়ক ব্যবস্থাকে আরও অকার্যকর করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বগুড়ার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বিবেচনা করা জরুরি।
প্রথমত, শহরের ভেতর দিয়ে চলমান রেললাইনের সমস্যার সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। এলিভেটেড রেলপথ নির্মাণ একটি উচ্চাভিলাষী চিন্তা। কিন্তু কার্যকর সমাধান হতে পারে, যা ট্রাফিক প্রবাহকে বাধামুক্ত করবে। তবে এর বাস্তবায়ন জটিল ও ব্যয়বহুল। এর বিকল্প হিসেবে শহরের বাইরে রেললাইন স্থানান্তর এবং নতুন সংযোগ লাইন তৈরি করা আরও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশ রেলওয়ের যে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে, সেখানে যদি নকশার কিছুটা পরিবর্তন এনে বগুড়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইনকে শহরের বাইরে দিয়ে নেওয়া যায়, এতে শহরের ভেতর থেকে রেলক্রসিং সম্পূর্ণ দূর হবে। সেই সঙ্গে বিদ্যমান রেললাইন করিডোরকে একটি প্রশস্ত পূর্ব-পশ্চিম সড়কে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যা যানজট কমাতে গেম চেঞ্জার হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সাতমাথাকেন্দ্রিক যানজট নিরসনে ‘কমপ্যাক্ট সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ গঠন করা যেতে পারে। এ ধারণার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পিত উন্নয়ন, মাল্টিলেভেল পার্কিং এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এমনকি নির্দিষ্ট এলাকায় যানবাহন নিষিদ্ধ করে শুধু পথচারী ও সাইকেল চলাচলের সুযোগ তৈরি করলে শহরের কেন্দ্রস্থলে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তৃতীয়ত, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কোনো শহরের যানজট সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব নয়। বগুড়ার জন্য বিআরটি বা ভবিষ্যতে এলআরটি চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে, বিশেষ করে মাটিডালি-বনানী এবং বাইপাস সংযোগ করিডোরে। একই সঙ্গে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর মধ্যে শাটল বাস চালু করা হলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমবে।
চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ‘ডিমান্ড ম্যানেজমেন্ট’ জরুরি। ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট জোনে সীমাবদ্ধ এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা হলে রাস্তার ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি শহরের ভেতর থেকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হলে ভারী যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
তবে এসব অবকাঠামোগত সমাধানের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর নগর প্রশাসন। বগুড়ার জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, তার কঠোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতাই নগর সমস্যার মূল কারণ। নগর প্রশাসনের ক্ষেত্রে দায়িত্বের স্পষ্টতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালে এসে বগুড়ার সামনে একটি মডেল ‘সিটি করপোরেশন বা মহানগরী’ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ এসেছে। এখনই যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তবে এই শহর উত্তরবঙ্গের একটি পরিকল্পিত, আধুনিক এবং বাসযোগ্য মহানগরে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় ঢাকার মতো অনিয়ন্ত্রিত নগর বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ড. ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী
পরিবেশ গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ
[email protected]
- বিষয় :
- নগর পরিকল্পনা
