প্রত্নতত্ত্ব
সিলেটের হারিয়ে যাওয়া এক নদীর ইতিহাস
আবেদ চৌধুরী ও তাহমিদ আনাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের দেশের নদীগুলো শুধু নেহাত জলধারা নয়; তারা ধরে রেখেছে জীবন ও জগতের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রাচীন সিলেট অঞ্চল একসময় বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– কামরূপ, লাউর, জৈন্তিয়া, গৌড়, তরফ, ব্রহ্মাচল, প্রতাপগড়, মনুকূল ও ইটা। এসব রাজ্যের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলা প্রাচীন তরফ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়, তরফ রাজ্য তৎকালীন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে একটি সামন্ত রাজ্য ছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তরফ রাজ্যের চতুর্সীমা ছিল– উত্তরে বরাক নদী, পূর্বে ভানুগাছের পাহাড়, দক্ষিণে বেজোড় পরগনা এবং পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে লাখাই পরগনা।
পরবর্তীকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রহ.) কর্তৃক তরফ রাজ্য বিজয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।
বর্তমান সময়ের গুগল ম্যাপ বা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন তরফ রাজ্যের চতুর্সীমার মধ্যে উল্লিখিত কেবল উত্তরে অবস্থিত বরাক নদীকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্ন জাগে– তরফ রাজ্যের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য এই নদী কোথায় হারিয়ে গেল?
এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথমে ইন্টারনেটে পাওয়া যায় ভারতের আসাম রাজ্য থেকে উৎপন্ন বরাক নদীর তথ্য। কিন্তু এই নদীর সঙ্গে প্রাচীন তরফ রাজ্যের বরাক নদীর সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, বরাক নামে আরেকটি বিলুপ্তপ্রায় নদীর অস্তিত্ব রয়েছে, যা মৌলভীবাজার জেলার বিজনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার
মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বানিয়াচং উপজেলার শুটকি নদীতে পতিত হয়েছে।
আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের সন্ধানে প্রায় ২৫০ বছর আগের মানচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে সার্ভেয়ার জেনারেল হিসেবে কর্মরত মেজর জেমস রেনেল দীর্ঘ ১৩ বছর জরিপ কার্য পরিচালনা করে ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘অ্যান অ্যাকচুয়াল সার্ভে অব দ্য প্রভিন্সেস অব বেঙ্গল, বাহার এটসেট্রা’ নামে একটি মানচিত্র প্রস্তুত করেন। এই মানচিত্রটি সমগ্র বাংলা ও বিহার অঞ্চলের প্রথম বৈজ্ঞানিক জরিপভিত্তিক মানচিত্র হিসেবে স্বীকৃত। উক্ত মানচিত্রে পূর্বদিকে অবস্থিত সিলেট অঞ্চল (‘এসআইএলইটি’ বানানে লিখিত) স্পষ্টভাবে চিহ্নিত। সেখানে তরফ রাজ্যের মধ্যে সাপের মতো
আঁকাবাঁকা একটি নদী অঙ্কিত হয়েছে, যার নাম ‘বিআরএসিকে’ বানানে উল্লিখিত। এটি ইতিহাসে বরাক নদীর অস্তিত্বের প্রথম প্রামাণ্য অঙ্কিত মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে আরও বিশদ অনুসন্ধানের জন্য বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃক প্রকাশিত জরিপ মানচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল অব ইন্ডিয়া কর্নেল এফ.বি. লোঞ্জের তত্ত্বাবধানে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এই মানচিত্রে তরফ রাজ্য তথা বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার বরাক নদীর অস্তিত্ব ও গতিপথ আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
নিখুঁত বিশ্লেষণের জন্য আধুনিক জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম, জিআইএস, প্রযুক্তির সহায়তায় ঐতিহাসিক মানচিত্রগুলোকে বর্তমান গুগল ম্যাপের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া বরাক নদীর প্রাচীন গতিপথ এবং এর শাখা-উপনদীগুলো নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, বরাক নদীর উৎপত্তি হয়েছিল সিলেট জেলার পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদী থেকে। সেখান থেকে নদীটি পশ্চিম দিকে আঁকাবাঁকা গতিপথ অনুসরণ করে হবিগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লাখাই উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নে কালনী নদীতে পতিত।
বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলার প্রধান নদী হিসেবে খোয়াই নদী স্বীকৃত হলেও প্রাচীন তরফ রাজ্যে বরাক নদী ছিল প্রধান নদী, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল ১১২.৮২ কিলোমিটার। বিজনা, খোয়াই ও করোঙ্গী নদী ছিল বরাক নদীর উপনদী এবং এর শাখা নদী ছিল খিরাউনা, গোপলা ও গৌরমালি।
একটি সম্পূর্ণ নদী বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু এর উৎপত্তিস্থল ও মিলনস্থলের নদী দুটি আজও বিদ্যমান। কেবল মাঝখানের বরাক নদীটি সময়ের প্রবাহে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে স্যাটেলাইট চিত্রে বরাক নদীর পশ্চিমের গতিপথ এককভাবে খোয়াই নদীর অংশ হিসেবে কেবল খোয়াই নামে কালনী নদীতে পতিত; পূর্বদিকের গতিপথের কোথাও নিচু কৃষিজমির মতো হয়ে আছে, কোথাও বদ্ধ জলাধার,
কোথাও গড়ে উঠেছে মানুষের আবাসস্থল। যারা এই এলাকায় বসবাস করেন, তারাও হয়তো জানেন না, তাদের বসতির নিচে একসময় প্রাচীন তরফ রাজ্যের এক সজীব স্রোতধারা প্রবাহিত ছিল।
এটি কেবল একটি বরাক নদীর গল্প। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এভাবে শত শত নদী সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে, যার অনেকটির ইতিহাস আজও অজানা।
বর্তমানে সরকার সারাদেশে খাল পুনর্খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা কি একবার ভেবে দেখতে পারি– আমাদের হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোকে মৃত্তিকার সলিলসমাধি থেকে পুনরুদ্ধার করে সেই প্রাচীন স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা যায় কিনা?
বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও খরার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় নদীগুলোকে পুনর্জীবিত করা মানব সভ্যতার
অস্তিত্বের দাবি।
আবেদ চৌধুরী ও তাহমিদ আনাম চৌধুরী: যথাক্রমে জিনবিজ্ঞানী এবং হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক
- বিষয় :
- প্রত্নতত্ত্ব
