আইন ও বিচার
সন্তানের ‘অপরাধে’ মা-বাবার শাস্তি
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অভিযোগটা ছিল ছেলের বিরুদ্ধে–গরু চুরির ‘চেষ্টা’র অভিযোগ। তা-ও অপ্রমাণিত। এ অভিযোগেই যুবককে ধরতে গিয়ে না পেয়ে তার মা-বাবাকে ধরে নিয়ে যায় গ্রামের মাতবররা। অতঃপর সালিশ। সালিশে মা-বাবাকে প্রকাশ্যে মারধর। এই অপমান সইতে না পেরে বাড়ি ফিরে মা জোসনা বানু গলায় রশি বেঁধে আত্মহত্যা করেন। ২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুর সদর উপজেলার খলিলহাটা এলাকায়।
খবরটি ছোট। কিন্তু ওজনে বিশাল। হয়তো গ্রামের সাধারণ দিনমজুর বলে এ নিয়ে তেমন লেখালেখি বা প্রতিবাদ হবে না। তবে এক অসহায় মায়ের আত্মাহুতির এ খবর আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
শুধু যে গ্রামীণ সালিশেই এমন হচ্ছে তা নয়। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও এমন আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। আসামিকে না পেয়ে তারা আসামির মা-বাবা, ভাইবোনকে পর্যন্ত ধরে নিয়ে যায়। এই তো মার্চের প্রথম সপ্তাহেই নওগাঁর মহাদেবপুরে এমনই এক ঘটনা ঘটেছে। খবরমতে, ঘটনার দিন উপজেলার হাতুড় ইউনিয়নের মালাহার উত্তরপাড়া গ্রামে মহাদেবপুর থানার ক’জন পুলিশ পরোয়ানাভুক্ত আসামি এমরানকে গ্রেপ্তার করতে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে এমরান পালিয়ে যান। এ সময় এমরানকে না পেয়ে পুলিশ তাঁর বাবা আব্দুল হামিদকে (৬৬) ধরে আনার চেষ্টা করে। এ নিয়ে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পুলিশ আব্দুল হামিদকে লাথি মেরে ফেলে দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান (সমকাল, ৬ মার্চ, ২০২৬)।
নিঃসন্দেহে এ জাতীয় ঘটনা মানবাধিকার-সংক্রান্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের ব্যত্যয়। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে এমনটি ঘটে বলে আমার জানা নেই। ঘটলেও তার তদন্ত হয়; অবস্থাবিশেষে বিচারও হয়। নওগাঁর উপরোক্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নড়াচড়া দেখিনি। সেই দূর কৈশোরে ১৯৭১ সালে শুনতাম, ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে–এ অভিযোগে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাপ-মাকে ধরে নিয়ে যেত। একটা স্বাধীন দেশে এই একুশ শতকে এসেও একজনের অপরাধে আরেকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া কিংবা ধরে নিয়ে সালিশে মারধর করা চলছে! সন্তানের অপরাধে বাবা-মায়ের শাস্তি–এখনও গেল না এ আঁধার।
কদিন আগেই আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপন করেছি। এই ৫৫ বছরে অনেক দিক দিয়ে আমাদের অনেক অর্জন থাকলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। গত ৫৫ বছরে দেশে যেসব দল ক্ষমতায় এসেছে, সবাই আইনের শাসনের দিকটা এড়িয়ে গেছে। এমনকি গণতন্ত্রকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি। তারা গণতন্ত্র বলতে দেশের মানুষকে বুঝিয়েছে কেবল ভোটের স্বাধীনতা; একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মানুষ ভোট দেবে, ভোট দিয়ে সরকার রাখবে বা সরকার পরিবর্তন করবে–এটাই যেন গণতন্ত্র। গণতন্ত্র যে সমাজ জীবনের সবকিছুর মাঝেই চর্চা এবং লালনের একটা বিষয়, গণতন্ত্র আর আইনের শাসন যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তা কাউকেই বুঝতে দেয়নি। অবশ্য বুঝতে দেয়নি তাদের নিজেদের স্বার্থেই। কারণ তারা জানে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেলে বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণে ভোটতন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্রকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছে সবাই। গণতন্ত্রের যথাযথ বিকাশ না ঘটার কারণে আইনের শাসনও বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। ফলে গ্রামীণ সালিশের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা গ্রামজীবনে শিকড় গেড়ে বসছে এবং ক্রমেই তা ডালপালা বিস্তার করে চলেছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশে স্মরণাতীত কাল থেকে সালিশ নিষ্পত্তির অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু অতীতে তাদের কাজ ছিল মূলত গ্রাম পর্যায়ে জমাজমি বা দেওয়ানি প্রকৃতির অন্য কোনো বিষয় নিয়ে উদ্ভূত ঝগড়াঝাঁটি নিরসন বা কনফ্লিক্ট রেজুলেশন। এখন ফৌজদারি অপরাধ নিয়েও সালিশ হয় এবং সালিশের নামে ঘটে যথেচ্ছাচার।

কয়েক দশক আগেও দেখা যেত কোনো গ্রামে বড় কোনো ঝগড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে আশপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের প্রভাবশালী মুরব্বিদের সমন্বয়ে সালিশের ব্যবস্থা করা হতো। তারা একত্রে বসে বিবদমান পক্ষগুলোর সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত দিতেন। এই সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা কারও ছিল না। এখন সেই ব্যবস্থা আর নেই। বর্তমানে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাই হন সালিশের হর্তাকর্তা। অতীতে সমাজপতিরা সালিশ করলেও রাষ্ট্রীয় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না বা দিতেন না। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে তারা সালিশের নামে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজেও হস্তক্ষেপ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে এমন অভিযোগও শোনা যায়, সালিশের নামে রীতিমতো ব্যবসা জমে বসেছে; টাকার বিনিময়ে বেচাকেনা হচ্ছে সালিশের সিদ্ধান্ত। এর ফলে শতাব্দীপ্রাচীন সালিশ ব্যবস্থা তার অতীতের গৌরব আর ধরে রাখতে পারছে না।
অন্যদিকে সুষ্ঠু গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি কিংবা দুর্বলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও নিজেদের সমাজ তথা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না ভেবে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের কাছে দায়বদ্ধ বলে মনে করে। এবং ক্ষমতাসীন দলকে খুশি করার জন্য যা করা দরকার তা করতে দ্বিধান্বিত হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে তারাও নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক সালিশ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেন। এর ফলে একদিকে গ্রাম পর্যায়ে দুর্বলের ওপর প্রভাবশালীদের অত্যাচার বাড়ছে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমছে।
আগে এ ধরনের ঘটনায় রাজধানীতেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হতো, মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা অকুস্থলে ছুটে যেত। এখন মনে হয়, কোনো মহলেই এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই।
এর ফল যে ভালো হতে পারে না, জামালপুরের জোসনা বানুর আত্মাহুতি তা আমাদের সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। জোসনা বানু তো তাও মরে গিয়ে অপমান ঢেকেছেন, কিন্তু এ ঘটনায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো রাষ্ট্রের আসল চেহারা যে নগ্ন হয়ে পড়েছে, তা ঢাকবে কে?
মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- মোশতাক আহমেদ
