ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চশিক্ষায় এআই সংযোজন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কতা

উচ্চশিক্ষায় এআই সংযোজন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কতা
×

এআই শক্তিশালী প্রযুক্তিগত হাতিয়ার বটে, কিন্তু এটি সব ধরনের জ্ঞানচর্চার সার্বজনীন পদ্ধতি নয়

এম এম শহিদুল হাসান

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৪৭

 একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  দ্রুত জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষকে গভীরভাবে আগ্রহী করে তুলেছে। সহজভাবে বলতে গেলে, এআই হলো এমন এক কম্পিউটার-ভিত্তিক ব্যবস্থা, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন হয়—এমন কাজ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডাটা থেকে শেখা, বিভিন্ন ধারা বা প্যাটার্ন শনাক্ত করা, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা বা কিছু ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়ন করা। এই এআই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অংশ হলো মেশিন লার্নিং, যার মাধ্যমে কম্পিউটার নিজে নিজেই তথ্য থেকে শেখার সক্ষমতা অর্জন করে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সব স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে এআই ও মেশিন লার্নিং অন্তর্ভুক্ত করার কথা জোড়ালোভাবে বলে আসছেন। এই আগ্রহ স্বাভাবিক হলেও বিষয়টি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে—যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক (ধারণাগত) গুরুত্ব এবং ব্যবহারিক (প্রাসঙ্গিক) প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য করা হবে, এবং বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
মূলত এআই একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত হাতিয়ার, কিন্তু এটি সব ধরনের জ্ঞানচর্চার সার্বজনীন পদ্ধতি নয়। আলাদা একাডেমিক প্রোগ্রামগুলি ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাপদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্বকে বোঝে—ইতিহাসভিত্তিক, ব্যাখ্যামূলক, তাত্ত্বিক, পরীক্ষামূলক কিংবা নীতিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে। সব স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য প্রযুক্তিগত এআই ও মেশিন লার্নিং বাধ্যতামূলক করলে প্রতিটি প্রোগ্রা্মের নিজস্ব বৈশিষ্টগুলি হারানোর ঝুঁকি থাকে এবং শিক্ষা কেবল একটি সংকীর্ণ, উপকরণগত দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করবে। ফলে, এগুলি যান্ত্রিক দক্ষতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা হয়তো কিছু টুল ব্যবহার শিখবে, কিন্তু কখন—বা আদৌ—সেগুলো ব্যবহার করা যুক্তিসংগত, সে বোধ তৈরি নাও হতে পারে।

কিছু প্রোগ্রামের ছাত্ররা এআই লিটারেসি জানলেই হবে আর বাকী প্রোগ্রামের ছাত্ররা অবশ্যই এআই-এ প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এআই মানে কোড লেখা বা অ্যালগরিদম তৈরি শেখা নয়। এর অর্থ হলো—যে কোনো বিষয়ের শিক্ষার্থী যেন বুঝতে পারে এআই কী করতে পারে এবং কী পারে না, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়, কোথায় পক্ষপাত বা বৈষম্য ঢুকে পড়তে পারে, এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক প্রভাব কী হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এআই লিটারেসি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে অধিকাংশ ডিজিটাল প্রযুক্তি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, স্থানীয়ভাবে নকশা বা উন্নয়ন করা হয় না। স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অপব্যবহার, অমিল এবং বৈষম্যের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এমন স্নাতক তৈরি করা জরুরি, যারা এআই-এর ফলাফল, তথ্যের উৎস এবং ভেতরে থাকা অনুমানগুলোকে সমালোচনামূলকভাবে প্রশ্ন করতে পারে—এটি শুধু শ্রমবাজারের জন্য নয়, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও নৈতিক শাসনের জন্যও অপরিহার্য।

অন্যদিকে, এআই ও মেশিন লার্নিং–এ প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিষয়। এর জন্য গণিত, পরিসংখ্যান, লিনিয়ার অ্যালজেবরা, সম্ভাব্যতা তত্ত্ব, নিউরোসায়েন্স ও নিউরাল নেটওয়ার্ক, প্রোগ্রামিং এবং সিস্টেমস থিংকিংয়ের মতো বিষয়ে শক্ত ভিত্তি প্রয়োজন। এগুলো ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা দক্ষতা, যা সংক্ষিপ্ত বা ভাসাভাসা পাঠের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। সব বিষয়ে অল্প অল্প করে শেখালে এমন স্নাতক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যাদের না আছে গভীরতা, না আছে আত্মবিশ্বাস।

এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত দুটি ভিন্ন লক্ষ্য স্পষ্টভাবে আলাদা করা। প্রথমত, সব শিক্ষার্থীর জন্য এআই লিটারেসি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যেসব ক্ষেত্রে এআই ও মেশিন লার্নিং সরাসরি পেশাগত চর্চাকে প্রভাবিত করছে—যেমন প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, কৃষি, অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা—সেখানে প্রযুক্তিগত কোর্স যুক্ত করা শিক্ষাগতভাবে যুক্তিসংগত এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। এসব ক্ষেত্রে এআই কেবল একটি টুল নয়; এটি ক্রমেই সমস্যা সমাধানের অবকাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে। এই দুটি লক্ষ্যকে এক করে ফেললে পাঠ্যক্রম অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারী হয়ে পড়ে এবং শেখা হয় ভাসা ভাসা।
অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষার উদাহরণ ধরা যাক। এসব শাস্ত্র এমনিতেই পরিমাণগত বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পরিসংখ্যান, ইকোনোমেট্রিক্স, অপটিমাইজেশন ও পূর্বাভাস—এগুলোই তাদের বিশ্লেষণী ভিত্তি। এই অর্থে মেশিন লার্নিং কোনো ভিন জিনিস নয়; বরং এটি প্রচলিত বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃত করে, বড় পরিসরে প্রবণতা শনাক্ত ও পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। সুচিন্তিত এআই ও মেশিন লার্নিং কোর্স শিক্ষার্থীদের ইকোনোমেট্রিক বিশ্লেষণ ও ডেটানির্ভর পূর্বাভাসের পার্থক্য বুঝতে, অর্থ ও বিপণনে অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনুধাবন করতে, এবং স্বয়ংক্রিয় নীতিনির্ধারণী টুল সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে অর্থনীতি ও ব্যবসা মূলত তত্ত্বনির্ভর শাস্ত্র। এখানে মডেলের মূল্য শুধু পূর্বাভাসের নির্ভুলতায় নয়, বরং মানুষের আচরণ, প্রণোদনা, প্রতিষ্ঠান ও সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতায়। অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে সংযোগ না রেখে কেবল প্রযুক্তিগত মেশিন লার্নিং শেখালে এই ব্যাখ্যামূলক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এসব ক্ষেত্রে মেশিন লার্নিং–এর ভূমিকা হওয়া উচিত তত্ত্ব ও ইকোনোমেট্রিক্সকে সম্পূরক করা, তার বিকল্প নয়।
একই যুক্তি অন্যান্য বিশেষায়িত শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে এআই প্রয়োগ করতে হলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান, বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। প্রকৌশলে এআই–কে বুঝতে হবে বৃহত্তর সামাজিক-প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে, একক কোনো সমাধান হিসেবে নয়। এই অর্থে বিশেষায়ন কোনো অভিজাত মনোভাব নয়; এটি শিক্ষাগত সংহতির প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই পার্থক্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালো করে। দৃশ্যমান ডিজিটালাইজেশন সত্ত্বেও অধিকাংশ খাতে স্বয়ংক্রিয়তা এখনো অসম ও সীমিত। অর্থনীতি এখনও প্রধানত শ্রমনির্ভর, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মূল ভূমিকা পালন করছে, এবং উন্নত ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাস্তবে খুব সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ ছাড়া বিপুলসংখ্যক প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত এআই স্নাতক তৈরি করলে হতাশা, আংশিক বেকারত্ব এবং সনদের অবমূল্যায়নের ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষা উৎপাদনশীল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি না হয়ে কেবল সনদ প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা গড়ে তোলা—সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, পরিমাণগত যুক্তি, সমস্যা নির্ধারণের দক্ষতা এবং নৈতিক বিচারবোধ। এগুলো এআই শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং এর পূর্বশর্ত। যেসব স্নাতকের মধ্যে এই ভিত্তিগুলো থাকবে, তারা প্রযুক্তি দ্রুত এগোক বা ভিন্ন পথে মোড় নিক—সব পরিস্থিতিতেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে।
নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতে এআই একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। প্রশ্নটি তাই এআই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে কি না—তা নয়; বরং কীভাবে, কোথায় এবং কোন গতিতে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রযুক্তিগত উৎকণ্ঠা নয়, চিন্তাশীল বিশ্লেষণনির্ভর সংস্কারই শিক্ষার্থী ও সমাজ—উভয়ের জন্য বেশি কল্যাণকর হবে।

সব শিক্ষার্থীর জন্য এআই লিটারেসি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গভীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা—এই পার্থক্যভিত্তিক পথই একটি টেকসই ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ দৃষ্টিভঙ্গি। এটি জাতীয় সক্ষমতার সঙ্গে শিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে, শাস্ত্রের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে, এবং স্নাতকদের কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়—বরং বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রযুক্তির ভূমিকা গঠনের উপযোগী নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করে।

এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×