ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্বব্যবস্থা

আধিপত্যবাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় বিপর্যস্ত মানবিক মূল্যবোধ

আধিপত্যবাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় বিপর্যস্ত মানবিক মূল্যবোধ
×

মনজুর রশীদ

মনজুর রশীদ

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:২৩ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৪১

মানুষ পৃথিবীতে একবারই জন্ম নেয় এবং একবারই মৃত্যুবরণ করে। প্রকৃতির অমোঘ এই নিয়মের ঘোরটোপে পড়েই একবার যে চলে যায়, তাকে আর কখনো ফিরে আনা যায় না। মানুষের প্রত্যাশা থাকে, যতদিন সে বেঁচে থাকবে একটা সুস্থ, সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবন যেন তার জীবন জুড়ে মিশে থাকে। সুন্দর ও মানবিক জীবনযাপনের জন্য প্রশান্তির আশা মানুষকে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে অদৃশ্যভাবে প্রেরণা জোগায়। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেসব মৌলিক বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার তার মধ্যে শান্তি হল অন্যতম। সকলেই আসলে শান্তি চায়। একইসাথে আবার প্রশ্নও এসে যায়- সকলেই যদি শান্তি চায়, তবে বিশ্বজুড়ে এতো অশান্তি কেন?

বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির এ যুগে সভ্যতার ক্রমসম্প্রসারণ ও মানুষের দর্শন-মনন-প্রজ্ঞার অপরিসীম বিস্তৃতি ঘটেছে বিপুলভাবে। এই বিস্তৃতি মানুষের ভেতর তৈরি করে দিচ্ছে মারাত্মক ইগো, কখনো যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, জাতি থেকে আরেক জাতিতে, রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রের মধ্যে আধিপত্যবাদি চেতনাকে ক্রমাগতভাবে উসকে দিচ্ছে। যে কারণে আজ মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, এক ধর্মের সাথে আরেক ধর্মের মধ্যে শক্তিমত্তায় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতার নামে ক্রমাগতভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, অভাবনীয় স্খলন-পতন-বিভেদ-বিদ্বেষ-বিপর্যয়-বীভৎস কার্যকলাপ ইত্যাদি তামসিক উল্লাস প্রচন্ডভাবে ব্যাহত করছে মানবিক শুভ চেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ। ফলে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের আজ কিংকর্তব্যবিমুঢ় কিংবা দিশেহারা হওয়া ছাড়া যেন অন্য কোন উপায় নেই।

বিশেষ করে, ২০১৯ সনের ডিসেম্বরে চীনের উহানে শনাক্ত হওয়া করোনা ভাইরাস যা কোভিড-১৯ নামে পরিচিত যা পরবর্তীতে ২০২০ সালের শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল,সেই ভাইরাসের আগ্রাসী থাবায় ক্ষতবিক্ষত বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে সেই বিপর্যয় কাটিয়ে অনেকটা স্বস্তিতে ফেরার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছিলো, ঠিক সেই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামক এক মহাদৈত্যের বিগত ২০২৫ এর জানুয়ারি মাসে আমেরিকার দ্বিতীয় বারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তিনি যেন নতুন উন্মাদনায় মেতে উঠতে শুরু করলেন। বিশেষ করে ইউক্রেন আর রাশিয়ার মধ্যেকার চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের পাশে থেকে, আর দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু রাষ্ট্র ইজরায়েল এর পক্ষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে ফিলিস্তিনের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যে চরম ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছেন, কয়েক মাস বিরতি দিয়ে যা এ বছরের ২৮ শে ফেব্রুয়ারিতে হঠাত করেই তাকে তিনি চরম পর্যায়ে উপনীত করতে শুধু ইরান বা বিশ্বকে নয়, নিজের দেশকেও এখন চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। 

ঘোষণা দিয়ে একটা দেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে সে দেশের মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রায় সকল বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকে একসাথে নির্মমভাবে হত্যা করতে করেছে ট্রাম্প। নিরীহ ও কোমলমতি শিশু, কিশোরদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একের পর এক ভয়াবহ বোমা মেরে ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডের সব ধরণের অবকাঠামো ভেঙে খানখান করে দেন আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই; কত ত্যাগ-তিতিক্ষা, গবেষণা আর শ্রম বিনিয়োগ করে গড়ে ওঠা শিল্প, কলকারখানা, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো গুড়িয়ে দিতে তিনি সংকোচ কাজ করেন না। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিন বিশেষ করে সেখানকার পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার মত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বুভুক্ষু মানুষকে দশকের পর দশক ধরে নরক যন্ত্রণা দিয়ে যে অপশক্তি প্রতিদিন নির্বিচারে রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে; তাদের জুলুমবাজ দখলদার বাহিনীকে দিয়ে অন্যদেশের সম্পদ লুন্ঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করার পরও আরও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর উছিলা খুঁজে বের করতে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এতকিছুর পরও শান্তির ধর্ম ইসলামের পবিত্র ভুমিতে থাকা দেশগুলো এই বীভৎস শক্তির তাবেদারি করে অন্য মুসলিম দেশের উপর আক্রমণে তাদেরকে সহযোগিতা করে।  বাদবাকি মুসলিম বিশ্বের দেশসমূহ নিরব দর্শক হয়ে বসে আছে। আর এ সময় সংগত কারণেই মানবিক মূল্যবোধের এমন চরম দূরাবস্থা দেখে অন্তর জুড়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে। জাতিসংঘ, ওআইসির মত প্রতিষ্ঠান কেন আজও টিকে আছে- সেটাও একটা বড় প্রশ্ন?

বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে জায়নবাদি ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েল ও তার পরম মিত্র বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সারাবিশ্বে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যার মধ্যদিয়ে সেদেশের মানুষই শুধু নয়, সমগ্র পৃথিবীই  যেন এখন অতিক্রম করছে এক মহাসংকট। প্রতিটা দিন ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠছে এক একটা ভয়ংকরতম দিন। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট থেকে সৃষ্ট বহুবিধ সংকট এখন পুরো বিশ্বকে যে কোন সময় স্তব্ধ করে দিতে পারে। এমন অবস্থা বর্তমানে বেঁচে থাকা পৃথিবীর কোন মানুষ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেছে কিনা বলতে পারবোনা। প্রতিদিন মনে হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষা-সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব বোধহয় শেষ কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ এমন নিষ্ঠুরতম অমানবিক কর্মকান্ডকে রুখে দেয়ার সাধ্য যেন কারো নেই। 

লক্ষণ খুব সুস্পষ্ট যে, খুব শিগগির পৃথিবী বিভাজিত হয়ে একসাথে জ্বলে ওঠার সময় ঘনিয়ে আসছে। রক্তলোলুপ জিঘাংসু বাহিনীগুলোর বর্বরোচিত সন্ত্রাস-প্রতি সন্ত্রাসে সভ্যতার শরীরজুড়ে রক্তের আল্পনা সবাই আজ চোখের সামনে দেখছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে মনে—¬¬ আমরা এ কোন সভ্য জগতে বসবাস করছি। একবিংশ শতকে এসে আমরা কী এরকম আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সভ্যতার নামে বর্বরতার চরম নৃশংসতা দেখার প্রত্যাশায় এতদিন অপেক্ষা করেছি? সারা দুনিয়ার সামান্য কয়েকজন খলনায়কের সক্রিয়তায় বিবেক পুড়ছে, কপাল পুড়ছে, মানুষ পচছে প্রতিদিন। আর এসব দেখে মনে হয় হত্যার নামে মানুষের মৃত্যু তো ঘটছেই, কিন্তু তারচেয়ে কি বিশ্ব বিবেকের মৃত্যু বেশি ঘটছেনা? এ যেন এক অদ্ভুত সমীকরণ। যে সমীকরণের গাণিতিক কোনো মূল্য নেই। তবে দর্শনতাত্ত্বিক একধরনের অতি বায়বীয় সম্পর্ক আছে। আবেগ আর বিবেকের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই মানুষকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সেই বৈপরীত্যের লড়াইটা মানুষকে টানতে টানতে এমন একটা শূন্যতায় নিয়ে যায় যেখানে ফলাফলটা অনেকটা অমীমাংসিত খেলার মতো বলেই প্রতীয়মান হয়।

আমরা সকলেই জানি যুদ্ধের পরিণতি ধ্বংস ও সবর্নাশ। তবে বিশ্বের সব মানুষই শান্তি চায়। ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’— শ্লোগানটি আমাদের সকলেরই পরিচিত। যুদ্ধের প্রাণহানি আর ধ্বংসলীলা আজ গোটা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। যেখানে শান্তি নামক শব্দটা আমাদের নিরাপত্তা ও প্রশান্তি অর্জন করতে সাহায্য করবে এবং আমাদের জীবনের সকল উদ্বেগ ও বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে, সেখানে যদি সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটাকেও বলতে হয় ‘মৃত্যু নয়, জীবন চাই’ – এরচেয়ে মর্মস্পর্শী বাক্য আর কি হতে পারে?

মনজুর রশীদ: সমাজ বিশ্লেষক ও গবেষক 
 

আরও পড়ুন

×