ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যুদ্ধের আগুনে জ্বালানি 

হরমুজ থেকে ঢাকায় ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক সংকটের অর্থনীতি

হরমুজ থেকে ঢাকায় ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক সংকটের অর্থনীতি
×

জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী

মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৫৪ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৫৫

যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ইতিহাস বহুবার বিচার করেছে- কে জিতল, কে হারল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় সেই প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে। কারণ, আধুনিক ভূরাজনীতিতে যুদ্ধের প্রকৃত পরিণতি নির্ধারিত হয় এর অর্থনৈতিক অভিঘাতে। ইরান ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে, যেখানে সামরিক সংঘর্ষের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। আজকের এই সংকটে কোনো একটি দেশ এককভাবে পরাজিত নয়; বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই যেন একটি অদৃশ্য চাপের মধ্যে আটকে পড়েছে।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এটি সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যাকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ‘চোকপয়েন্ট’ বলা হয়। প্রতিদিন বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৯ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলো থেকে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই পথ অপরিহার্য। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া-এর মতো জ্বালানি-নির্ভর বৃহৎ অর্থনীতিগুলো এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই প্রণালীতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, আর বর্তমানে চলমান সংঘাত সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।

সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় জ্বালানিবাহী ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু জাহাজ মাঝপথে আটকে পড়ছে, আবার অনেক জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ বিকল্প পথে যাত্রা করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ছে এবং খরচ বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধঝুঁকির কারণে বীমা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি ‘ডমিনো ইফেক্ট’ তৈরি হয়েছে, যেখানে জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে খাদ্য, শিল্পপণ্য এবং ভোক্তা পণ্যের বাজারেও চাপ সৃষ্টি করছে।

ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১৩০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উচ্চ পর্যায়। একই সঙ্গে এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ বিঘ্নের কারণে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে পৌঁছাতে পারেনি, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে জ্বালানি সংকটের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে, যা একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই সংকটের প্রতিফলন শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশের নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। ফিলিপাইন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকটের কারণে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে। এমনকি আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাসের সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এইসকল উদাহরণ দেখাচ্ছে জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।

যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর অর্থনীতিও এই সংঘাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করছে। মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল সামরিক ব্যয় শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের বাজেটেই চাপ সৃষ্টি করে না; এটি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে, যা বিনিয়োগ, বন্ড বাজার এবং মুদ্রাবিনিময় হারের ওপর প্রভাব ফেলে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তেলের দামের আকস্মিক উল্লম্ফন প্রায়ই বৈশ্বিক মন্দার সূচনা ঘটিয়েছে, এবং বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করছে।

এই বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে। বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামো মূলত আমদানিনির্ভর, যেখানে ডিজেলের প্রায় শতভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের হাতে প্রায় ৯০ দিনের সমপরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করলেও বাজারে অস্থিরতা কমাতে পারেনি। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল বিক্রি এবং কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা—এসবই মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক সংকট’ বা আতঙ্কজনিত চাহিদার প্রতিফলন। বাস্তবে পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। বছরে প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন পেট্রোল এবং ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেনের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় কনডেনসেট থেকে প্রায় অর্ধেক পেট্রোল এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।

সিলেট অঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিদিন প্রায় ৩,৪৫০ ব্যারেল পেট্রোল এবং প্রায় ৬০০ ব্যারেল অকটেন উৎপাদিত হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক। একই সময়ে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদিত হয়েছে। ফলে বাস্তব অর্থে সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা না থাকলেও বাজারে আতঙ্ক এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিয়ে একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে ডলার চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে দ্রুত হ্রাস করে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সরকার যদি অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ভর্তুকি বাড়ায়, তাহলে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে একটি দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি হয়—একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে আর্থিক ভারসাম্যহীনতা।
এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা, যেখানে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির জন্য বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করা, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় খাতে জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করে একটি কার্যকর চাহিদা ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল আমদানিনির্ভর নীতির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে অর্থনীতিতে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না হয়।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমান সংঘাত আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে—যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু হয়ে সেই অভিঘাত ঢাকার ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাই এই সংকটকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে একটি কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এই সংকটই ভবিষ্যতের জন্য একটি আরও সহনশীল, টেকসই এবং নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম: ব্যাংকার
 

আরও পড়ুন

×