ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

দেশপ্রেমের জোয়ার আবারও তুলতে হবে

দেশপ্রেমের জোয়ার আবারও তুলতে হবে
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৪

পৃথিবীতে ধর্মের নামে অনেক অনাচার হয়েছে; হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ অজস্র ঘটনা ঘটেছে। তারপরেই বোধহয় দেশপ্রেমের স্থান; ওই বোধও কিছু কম রক্তপাত ঘটায়নি। ‘দেশপ্রেমিক’ হিটলার-মুসোলিনির কাহিনি গালগল্প নয়। অত্যন্ত বাস্তব ও রূঢ় সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারে লুণ্ঠনের অভিপ্রায়কে অতি উচ্চে তুলে এবং তার সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টিতে ব্যস্ত রয়েছেন। দেশের বাইরে তো অবশ্যই, দেশের ভেতরেও। 

কিন্তু এসব হচ্ছে দেশপ্রেমের বিকৃতি। যথার্থ দেশপ্রেম দেশের মানুষকে ভালোবাসে; অন্ধ হয় না। এই দেশপ্রেমকে গণতান্ত্রিক হতে হয়। অর্থাৎ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে যে অস্বীকার করে না, বরঞ্চ তাকে স্বীকার করে নিয়ে এবং রক্ষা করার প্রয়োজনেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এই দেশপ্রেম আত্মরক্ষামূলক। অন্য দেশকে আক্রমণের কথা সে ভাবে না; নিজের জন্য দাঁড়াবার একটা জায়গা খোঁজে। 

এই যে স্থানটির কথা ভাবছি, এতে মাতৃভাষার অবস্থান একেবারে প্রাথমিক। মানুষের সংস্কৃতি নানা উপাদান দিয়ে গড়া, সব উপাদানই জরুরি, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর যেটি সে হচ্ছে ভাষা। ভাষা ধর্মের চেয়েও বড়। আমাদের জন্য এটা একটা বড় রকমের গৌরবের ব্যাপার এই যে, আমরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন করেছি এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ওই আন্দোলনের ভূমিকা গৌণ নয়; মুখ্য। আমাদের ওই আন্দোলন সারাবিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়; আসলে দৃষ্টান্ত হিসেবেই গৃহীত হয়েছে। দেশে দেশে এখন নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার চেষ্টা চলছে। বিশ্বায়নের মারাত্মক আগ্রাসনের মুখে বিপন্ন-বিপর্যস্ত সংস্কৃতিগুলো মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে আত্মরক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। মাতৃভাষা হচ্ছে শিক্ষার শ্রেষ্ঠ বাহন এবং আত্মপরিচয়ের প্রধান অবলম্বন।
যে দেশপ্রেম গণতন্ত্রকে সঙ্গে নেয়, তার চরিত্রটা হলো মায়ের মতো, স্নেহ ও মমতায় ভরপুর। উল্টো দিকে আগ্রাসী ও ফ্যাসিবাদী দেশপ্রেম হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক। মাতৃভাষা মায়ের সঙ্গে জড়িত।

একাত্তরে দেশপ্রেমিক বাঙালির জন্য প্রধান সত্য হয়ে উঠেছিল মেয়েদের ওপর অত্যাচার। এককভাবে অন্য কোনো ঘটনা দেশে-বিদেশে বাঙালিকে অতটা আতঙ্কিত ও প্রতিরোধব্যাকুল করেনি, যেমনটি করেছিল নারী-নির্যাতন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুজিবনগরে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের কার্যকরী কমিটির একটি সভা হয়। সেই সভাতে তখনকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ হানাদার বাহিনীর বর্বরতার ছবি তুলে ধরতে গিয়ে নারী-নির্যাতনের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। বলেছেন, নাৎসিরা গ্যাস চেম্বারে পুরে মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, কিন্তু হানাদার পাকিস্তানিরা তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাজউদ্দীনের ভাষায়, “মাতৃজাতির ওপর পাশবিক অত্যাচার করে পরে তারা আমার মায়ের জাতিকে গাছে বেঁধে উলঙ্গ করে লজ্জাস্থানে শুটিং করেছে। এর প্রতিশোধ বাংলার প্রতিটি সুসন্তানকে নিতে হবে। আমার এই মায়ের জাতিকে সম্মানের আসনে ফিরিয়ে নিতে হবে। যতদিন পর্যন্ত আমরা তা পারব না, ততদিন পর্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হবো না, ততদিন পর্যন্ত আমরা মায়ের সুসন্তান বলে দাবি করব না” (আবদুল আজিজ বাগমার, ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন: উন্মেষ ও অর্জন’, পৃ ২২০)। 

মূল কথাটা এটাই, দুর্দশা দেখে যদি হতাশ না হতে চাই; যদি আত্মসমর্পণে সম্মত না হতে চাই, এবং এগিয়ে যেতে না চাই অধঃপতনের দিকে, তাহলে দেশপ্রেমকে অবশ্যই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য ওটিই প্রশস্ত পথ। 

দেশপ্রেম নিয়েই দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দেশপ্রেমকে যেন পর্যাপ্ত মনে না করি। কেমন ধরনের দেশপ্রেম চাই– সেই প্রশ্নটি তো সঙ্গে সঙ্গেই আসবে। প্রয়োজন সেই দেশপ্রেম, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলবার লক্ষ্যে কাজ করবে। আর গণতন্ত্র বলতে বুঝব নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন এবং সর্বোপরি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি।

জোয়ার যেটি এসেছিল সেটা এখন স্তিমিত বটে, কিন্তু তাকে আবার সতেজ করা সম্ভব। তার জন্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার হবে। বড় দুদলের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে পরীক্ষিত হয়ে গেছে, এবং ওই ঘাতকেরা পরীক্ষায় বেশ ভালোভাবেই ফেল করেছেন। ভরসা নতুন নেতৃত্বের ওপরেই, যে-নেতৃত্ব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে। ওই আন্দোলন এগিয়ে গেলে ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে মানুষ সরে আসবে। 

দেশ না থাকলে দেশের নেতারা থাকবেন কোথায়, তা দেশকে রক্ষা করতে তারা চেষ্টা করুন কিংবা না-ই করুন। বাংলাদেশের অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ভূমি, বন্দর হতে বহু কিছু গোপন চুক্তির মাধ্যমে বিদেশিদের কাছে তুলে দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, গোপন চুক্তির বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্মতির ভিত্তিতেই চুক্তিটি করা হয়েছে। দেশবিরোধী এই চুক্তির ফলে দেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয় ন্যূনতম বিবেচনা করা হয়নি। অথচ এরাই পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।

দেশকে বাঁচাতে হবে, নইলে আমরা বাঁচব কী করে, তা ব্যক্তিগতভাবে আমরা যত বড়ই হই না কেন। দেশ না থাকলে বড় মানুষদের যে বিদেশিরা বড় মনে করবে, এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই।

প্লাবন একটা চলছে। সেটি সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও হতাশার। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা কমেছে। টাকার শাসন এখন অপ্রতিরোধ্য। যে কিশোর একদিন অন্যের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ত; অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত; তার চোখে স্বপ্ন এখন একটাই, দ্রুত বড়লোক হবার। এই লোভের তাড়নাতে তারা সবকিছু করতে পারে। ক’দিন আগে কয়েকজন কিশোর টাকার দুরন্ত লোভে তাদেরই পরিচিত একজন স্কুলছাত্রকে যেভাবে প্রথমে হত্যা এবং পরে টুকরো টুকরো করে কেটেছে, সেই কাজটাই নানা মাত্রা ও উপায়ে সমাজের সর্বত্র চলছে, মব সন্ত্রাসের বাতাবরণে। মায়া-মমতা চলে গেছে, ভয়ও নেই। অন্যদিকে লোকে এসব দেখে ও শুনে আতঙ্কিত ও ক্রুদ্ধ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সংগঠিত কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারছে না। সকলেই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে।

অপরাধ দমনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সে-দায়িত্ব পালনে অপারগ। তাতেই বোঝা যায়, এ-রাষ্ট্র কাদের দখলে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের অনেকেই অপরাধ দেখলে চিন্তিত না হয়ে উৎফুল্ল হয়– অপরাধীদের কাছ থেকে বখরা পাবে এই আশাতে।

প্লাবনটা পুঁজিবাদের। এ পুঁজিবাদ উৎপাদন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবনে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করে লুণ্ঠনে। লুণ্ঠনের প্রয়োজনে যা যা করা দরকার সবই করে; আপনজনকে হত্যাসহ। হাত কাঁপে না। এর বিরুদ্ধে বিপরীত প্লাবন চাই। স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সুসংগঠিত। দেশপ্রেমিক আন্দোলন আবশ্যক; যে আন্দোলন অন্ধ হবে না, জানবে যে তার লক্ষ্য হচ্ছে এই রাষ্ট্র ও সমাজকে গণতান্ত্রিক করা। এই আন্দোলন ছাড়া দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তা আমরা যতই কাঁদুনি গাই না কেন, কিংবা ক্রোধ প্রকাশ করি না কেন। এ কোনো নতুন আন্দোলন নয়। এটা ছিল, তাকে বেগবান ও গভীর করা প্রয়োজন, সংঘবদ্ধ হয়ে। এ ছাড়া দেশ বাঁচবে না। অর্থাৎ আমরা কেউই বাঁচব না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×