কেরানীগঞ্জ দুর্ঘটনা
অবহেলার আগুনে পুড়ছে জীবন
কেরানীগঞ্জ কারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনায় ছয়জন প্রাণ হারায়
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:০৯ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৫১
চলতি সপ্তাহের শুরুতে শনিবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে গ্যাসলাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই অঘটন আবারও আমাদের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে, যেখানে নিরাপত্তা বিধি মানার প্রবণতা কম। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ বা পুরান ঢাকার মতো এলাকায় আবাসিক ভবনের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা চালানোর নজির বহু আগের। গ্যাসলাইটারের মতো দাহ্য পদার্থ-নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা মানে সরাসরি শ্রমিকদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
এ ধরনের দুর্ঘটনাও নতুন নয়। চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড কিংবা নিমতলী অগ্নিকাণ্ড—প্রতিটি ঘটনাই আমাদের একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কেন আমরা বারবার একই ভুল করি? প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, আর কিছুদিনের জন্য প্রশাসনিক তৎপরতা; এরপর আবার সব আগের মতোই চলতে থাকে। ফলে দুর্ঘটনা যেন একটি পুনরাবৃত্ত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
মূল সমস্যা তিনটি স্তরে বিদ্যমান। প্রথমত, তদারকির দুর্বলতা। শিল্প কারখানাগুলোর লাইসেন্স প্রদান ও নিয়মিত পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মালিকদের দায়িত্বহীনতা। খরচ বাঁচাতে তারা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ বা নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেন না। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের অসচেতনতা ও অসহায়ত্ব। তারা জানেন ঝুঁকি আছে, কিন্তু বিকল্প জীবিকার অভাবে সেই ঝুঁকির মধ্যেই কাজ করতে বাধ্য হন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ। প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোকে আবাসিক এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোতে হয় নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, অন্যথায় বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তৃতীয়ত, সরকারি কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত ও হঠাৎ পরিদর্শন জোরদার করতে হবে এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে কারখানার মালিকরা হেলফেলা করবে। চতুর্থত, প্রতিটি কারখানায় বাধ্যতামূলক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ এবং তার সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরা, এবং কতটা তা ফলপ্রসূ হচ্ছে তাও বিচার করা দরকার। অন্যথায় এসব তদন্ত কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
কেরানীগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং দায়হীনতার প্রতিচ্ছবি। এই সমস্যাটি এখন কোনোরকম গৌণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি আমাদের বিশেষত বড় বড় শহরগুলোতে কেন্দ্রিয় একটি সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দূর্ঘটনাগুলো বারবার উঠে আসলেও আমরা কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য সামষ্টিক ব্যর্থতা।
এক্ষেত্রে বিশেষত বিভিন্ন পক্ষ থেকে তৎপরতা গড়ে তোলা জরুরি। সামাজিক সচেতনতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে স্রেফ ঘটনার পরপরই তৎপরতা দেখিয়ে আবার ঝিমিয়ে পড়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে প্রকট। বিশেষত সরকার ও নীতিনির্ধারণীমহল সদিচ্ছা দেখালে এই প্রাণহানী দূর্ঘটনা থেকে আমরা মুক্তি পাবো।
প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে। যদি এখনো আমরা কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক কদমতলী, নিমতলী কিংবা চুড়িহাট্টার পুনরাবৃত্তি ঘটবে—আর আমরা শুধু শোক প্রকাশ করেই দায় সেরে ফেলব।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- আগুনে পুড়ে মৃত্যু
- কারখানা
- অগ্নিনিরাপত্তা
