ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জাতিসংঘ, ইরান এবং সার্বভৌমত্বের সংকট

জাতিসংঘ, ইরান এবং সার্বভৌমত্বের সংকট
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কোনো বক্তৃতা বা ঘোষণার চেয়েও সত্যকে বেশি উন্মোচন করে। এমনই এক মুহূর্ত দেখা গিয়েছিল জাতিসংঘে, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বক্তব্য দিতে উঠে দাঁড়ান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি হল ত্যাগ করেন। এটি শুধু একটি প্রতিবাদ ছিল না; এক গভীর ফাটল।

যে কক্ষে পুরো পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করার কথা, সেখানে ফাঁকা আসন। এটি এক প্রতীকী প্রতিবাদ; ভেঙে পড়া বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই দৃশ্য আমাদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরছে: যখন মানবতার প্রতিনিধিত্ব করার কথা যে প্রতিষ্ঠানটির, সেটি আর মানুষের বিবেককে ধারণ করতে পারে না; তখন সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী?

জাতিসংঘ ঘিরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক অনেক। অথচ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক মহান লক্ষ্য নিয়ে– যুদ্ধ থামানো, নিরীহ মানুষকে রক্ষা করা এবং এমন একটি বিশ্ব গড়া, যেখানে প্রতিটি দেশের কণ্ঠ সমান গুরুত্ব পাবে। বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে। এই কাঠামোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসমতা। কিছু শক্তিধর দেশের হাতে রয়েছে এমন ক্ষমতা, যা পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। ভেটো ক্ষমতা সেই অসমতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

ফলে কী হয়?
বিশ্বের বহু দেশ একমত হলেও সিদ্ধান্ত আটকে যায়। ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়। কখনও কখনও তা সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়। প্রস্তাব পাস হয়; বিবৃতি দেওয়া হয়; জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। তবুও মাটিতে রক্তপাত থামে না। 

ফিলিস্তিন সেই ন্যায়বিচারের পরীক্ষাক্ষেত্র
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় ফিলিস্তিনে। বিশ্বজুড়ে মানুষ ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখছে; শিশুদের কান্না শুনছে; একটি জাতির বেঁচে থাকার সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করছে। রাস্তায় মানুষ নেমে আসছে; প্রতিবাদ করছে; কণ্ঠ তুলছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা? তা দেখছে, বলছে, কিন্তু থামাতে পারছে না। এই যে ব্যবধান মানুষের অনুভূতি আর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে– এখানেই আস্থার মৃত্যু ঘটে। অনেকের কাছে এখন এটি আর কেবল একটি ব্যর্থতা নয়; নৈতিক পতন।

ইরান অসম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক। এই ভাঙা বিশ্বব্যবস্থার মাঝে ইরান একটি ভিন্ন ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরান একটি দেশ, যার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই– তবুও এটি এমন দুই শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যাদের কাছে সেই ক্ষমতা রয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু সামরিক নয়; এক গভীর বৈশ্বিক অসমতার প্রতিফলন।
এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে টিকে থাকা সহজ নয়। এটি শক্তির লড়াই নয়; সহনশীলতার লড়াই। গ্লোবাল সাউথের অনেক মানুষের কাছে ইরানের এই অবস্থান এক ধরনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি দেশ, যা চাপে নত হয় না। একটি রাষ্ট্র, যা একটি অসম ব্যবস্থার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

এটি নিখুঁত সমর্থনের প্রশ্ন নয়; একটি অনুভূতির প্রশ্ন। সে অনুভূতি এমন– পৃথিবীর সব দেশ একই নিয়মে খেলে না। নীরবতা দুর্বলতা নয়; বাস্তবতা। বিশ্বের অনেক দেশ হয়তো অনেক কিছু ভাবছে, কিন্তু সব কিছু বলছে না। কেন? কারণ সার্বভৌমত্ব সবসময় পূর্ণ স্বাধীনতা নয়। অনেক দেশ আবদ্ধ ঋণের বোঝায়; বৈদেশিক নির্ভরশীলতায়; সামরিক জোট বা বিদেশি ঘাঁটির উপস্থিতিতে; বাণিজ্যিক সম্পর্কের চাপে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নীরবতা প্রায়ই একটি কৌশল।

এটি সমর্থন নয়; বেঁচে থাকার উপায়। রাষ্ট্রগুলো জানে, একটি ভুল বক্তব্য তাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তা কিংবা কূটনৈতিক অবস্থানকে বিপদে ফেলতে পারে। এভাবেই ক্ষমতা কাজ করে– সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দিয়ে নয়, বরং কোনটি বলা যাবে আর কোনটি বলা যাবে না, তার সীমা তৈরি করে।

একটি কাঠামো, যা আচরণ নির্ধারণ করে এই বাস্তবতা বোঝার জন্য– কোনো গোপন শক্তির ধারণা প্রয়োজন নেই। ব্যবস্থাটিই এমনভাবে গঠিত, যেখানে শক্তিধররা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। জোট নিরাপত্তার দিক নির্ধারণ করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিহাসের অসমতা বহন করে। ফলে ফলাফল অনেক সময় একই রকম দেখায়, যেন একটি অদৃশ্য নিয়ম কাজ করছে। কিন্তু সেটি কোনো একক নিয়ন্ত্রণ নয়। এটি একটি কাঠামো, যা কিছু দেশকে শক্তিশালী করে এবং অন্যদের সীমাবদ্ধ রাখে।

গভীর সংকট হলো, বৈধতার প্রশ্ন। আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি বৈধতার সংকট।
মানুষ প্রশ্ন করছে, দুর্বলদের রক্ষা করতে না পারলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্য কী? যদি দেশগুলো সত্য বলতে না পারে, তবে সার্বভৌমত্ব কতটা বাস্তব? যদি শক্তি নির্ধারণ করে কার কষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তবে ন্যায়বিচার কোথায়? এই প্রশ্নগুলো কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; আমাদের সময়ের বাস্তবতা। 

একটি পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব
জাতিসংঘে সেই নীরব প্রস্থান শুধু একটি প্রতিবাদ ছিল না; একটি সতর্কবার্তা। একটি বিশ্ব, যেখানে মানুষ আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না। একটি বিশ্ব, যেখানে নীরবতাও একদিন ভেঙে যায়। একটি বিশ্ব, যেখানে সত্য ধীরে ধীরে নিজের পথ খুঁজে নেয়।
ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপ, ইরানের প্রতিরোধ এবং নীরব দেশগুলোর অপ্রকাশিত অবস্থান– সব মিলিয়ে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে। এটি আর কেবল একটি সংঘাত নয়; এক পরিবর্তনের সূচনা।
যে পৃথিবী অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি একদিন ভেঙে পড়বেই। আর সেই ভাঙনের শব্দই হবে নতুন বিশ্বের জন্মধ্বনি।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী 

আরও পড়ুন

×