আন্তর্জাতিক
হরমুজ প্রণালীর জন্য নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা জরুরি
হরমুজ প্রণালী
সিনা ইমামি
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:০৭ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৫৫
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মূলত ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ শুরু করেছে। এ যুদ্ধ আমাদের অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে চুরমার করে দিয়েছে। ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি জটিল সংকটে জড়িয়ে পড়ছে, তখন বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে নতুন একটি বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। আর তা হল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি রাজনৈতিক পথ ক্রমশই জরুরি হয়ে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালীর উপকূলবর্তী দেশগুলোর কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রস্থানের কৌশল প্রদানের এক বিরল ও সম্মিলিত সুযোগ দেয়। হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি নতুন, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে দেশগুলো আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক পরিস্থিতির বিকল্প হল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেখা দেওয়া। এমন পরিস্থিতি হলে শেষ পর্যন্ত তেহরান একতরফাভাবে একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেবে।
নিজেদের অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য আনতে গিয়ে গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলো দুটি খারাপ বিকল্পের মাঝে আটকা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধের মাঝখানে ট্রাম্পের মুখোমুখি হওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে এবং ক্রমশ খামখেয়ালি হয়ে ওঠা এই নেতার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে।
বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তে অনিবার্যভাবে একটি নতুন ব্যবস্থা আসবে। কারণ সংঘাত বাড়তে থাকলে সব আঞ্চলিক রাষ্ট্রের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে। এমন কোনো পরিস্থিতি আর সম্ভব নয়, যেখানে ইরান লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকবে আর জিসিসি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে– যেমনটা ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ঘটেছিল।
২০ হাজার ডলার মূল্যের ড্রোন দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচল বাধাগ্রস্ত করার যে ক্ষমতা ইরানের রয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় যে দেশটির হাতে বিপুল প্রভাব। এই ড্রোনগুলো ভূগর্ভে উৎপাদন করা যায় এবং যেকোনো স্থান থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, হরমুজের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখন এই প্রভাবকে কাজে লাগানো হবে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্কে উত্থান-পতন ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই সম্পর্কটি বৈরিতায় পূর্ণ ছিল, তবে বিগত কয়েক বছরে এতে আমূল ও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলা এবং সম্প্রতি কয়েকটি জিসিসি রাজধানী থেকে ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার নিঃসন্দেহে অতীতের দিকে পশ্চাদপসরণ। তবে এই সংকট এটাও প্রমাণ করেছে যে, নিরাপত্তা একক কোনো ব্যাপার নয়, বরং একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বর্তমান যুদ্ধের মধ্যদিয়ে কীভাবে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতা এই অঞ্চলের সকল রাষ্ট্রকে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখী হয়ে পড়েছে তাই স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেশীর ক্ষতি করে নির্মিত নিরাপত্তা কাঠামো আর টেকসই নয়। ইরান ইতোমধ্যেই পূর্ববর্তী ব্যবস্থাটি ভাঙতে শুরু করেছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থাটির নকশা একচেটিয়াভাবে ইরানি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
ভবিষ্যতের পথনির্দেশের জন্য আমরা একটি আঞ্চলিক শৃঙ্খলা অর্জনে ইউরোপের সফল ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে পারি। নেপোলিয়নের আগ্রাসী যুদ্ধের পর ইউরোপকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে ভিয়েনা কংগ্রেস থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একের পর এক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পুনর্গঠনে মাইলফলকগুলো এ অঞ্চলের জন্য কেবল কোনো কাঠামো নয়, বরং অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করা উচিত।
হরমুজ প্রণালী একটি আইনি অসঙ্গতির মুখোমুখি; কারণ এটি বিশ্বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের মধ্যে অন্যতম, যার কোনো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক চুক্তি নেই। তুরস্কের মতোও নয়, যার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আংশিকভাবে বসফরাস ও দার্দানেলিসকে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ট্রে কনভেনশনের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, হরমুজ একটি বিধিবদ্ধ সামুদ্রিক কাঠামো ছাড়াই পরিচালিত, যা এটিকে ইতিহাসজুড়ে পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের কাছে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সুতরাং, বর্তমান যুদ্ধকে কিছুটা হলেও এই অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ফল হিসেবে বোঝা যেতে পারে।
‘হরমুজ কংগ্রেস’ আহ্বান করা হলে তা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কয়েকটি দিক সম্মিলিতভাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। যেমন– একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা, আইনি শূন্যতা পূরণ করা। এগুলি শুধু আমাদের নিজস্ব অঞ্চলের জন্যই কার্যকর হবে তা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিরও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
এই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি চুক্তি বিধিবদ্ধ করা, যা প্রণালীটির মর্যাদা আনুষ্ঠানিক রূপ দেবে এবং বর্তমানে অনুপস্থিত আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করবে। এর পাশাপাশি হরমুজের ব্যবস্থাপনা যাতে স্থানীয় অধিকার হিসেবেই থাকে, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি করা।
স্বল্পমেয়াদে এই কাঠামো হরুমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে পারে। এছাড়া ট্রাম্পকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ করে দেবে এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা এটি পুনরায় খুলতে সাহায্য করেছে বলেও দাবি উঠবে। দীর্ঘমেয়াদে এই কাঠামোটি জিসিসি দেশগুলোকে এমন এক পৃষ্ঠপোষকের হাত থেকে রক্ষা করবে, যে তার প্রধান মিত্র ইসরায়েলের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। তারা এমন এক মিত্র, যার বিকল্প বা যার সঙ্গে আমরা কেউই কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না।
সিনা ইমামি: আধুনিক ইরানের ইতিহাস ও রাজনীতির গবেষক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- হরমুজ প্রণালী
- ইরান
