আন্তর্জাতিক
ন্যায়সংগত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংগ্রাম শেষ হয় না
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
এই মুহূর্তে বিশ্ব কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। এটি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে– রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমশ এই অনুভূতি জোরালো হচ্ছে– বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মানবজাতির বৃহত্তর অংশের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। এটি কেবল একটি যুদ্ধ বা একটি অঞ্চলের বিষয় নয়। এটি কাঠামোর প্রশ্ন। এটি সেই প্রশ্ন– কে বৈধতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে; কার কষ্ট দৃশ্যমান হয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায়।
ফিলিস্তিন ও বৈশ্বিক বিবেকের সংকট
ফিলিস্তিনে চলমান ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। গ্লোবাল সাউথের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেসামরিক দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘদিনের দখল ও সহিংসতার ইতিহাস নিয়ে গভীর ক্ষোভ রয়েছে। তবুও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিভক্ত। যখন জনগণ প্রতিবাদ, সামাজিক মাধ্যম এবং নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে সোচ্চার হচ্ছে, তখন অনেক সরকার মৌন থাকে।
জনমত ও রাষ্ট্রের অবস্থানের এই ব্যবধান একটি গভীর বাস্তবতাকে তুলে ধরে– অনেক দেশ এমন এক নির্ভরশীলতার জালে আবদ্ধ, যা তাদের শক্তিশালী মিত্রদের বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান নিতে বাধা দেয়। তাই বৈশ্বিক ঐকমত্য প্রায়ই প্রকৃত বিশ্বাসের প্রতিফলন নয়, বরং বৈশ্বিক সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং শক্তির পরিবর্তনশীল ভারসাম্য
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘিরে যে উত্তেজনা চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু মানুষ ইরানকে দেখছে পশ্চিম-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে, যা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে, অনেকেই ইরানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে দেখে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছে, বিশেষত চলমান সংঘাত ও
মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে।
তবে এই সংঘাতগুলো সরল দ্বৈত বিভাজনে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো ইতিহাস, নিরাপত্তা-উদ্বেগ, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও প্রতিশোধের চক্রের ফল। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই উত্তেজনাগুলো একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ– এক-মেরু বিশ্বব্যবস্থার ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়া এবং একটি বিভক্ত, বহু-মেরু বিশ্বের উদ্ভব।
সমান সার্বভৌমত্বের মিথ
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোর সমান সার্বভৌমত্বের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাস্তবে
সার্বভৌমত্ব সমান নয়। এটি নির্ভর করে সামরিক ও জোটগত শক্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও ঋণ, জ্বালানি ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক, নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বিভাজনে দেশটির অবস্থানের ওপর। ফলে এমন একটি বিশ্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু রাষ্ট্র প্রায় অবাধে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আর অন্যেরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে বাহ্যিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।
গ্লোবাল সাউথের বহু দেশের জন্য এটি এক স্থায়ী টানাপোড়েন– আইনি স্বাধীনতা বনাম বাস্তব সীমাবদ্ধতা।
গণমাধ্যম, বর্ণনা ও বাস্তবতার সংজ্ঞা
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ ও রাজনীতি কেবল অস্ত্র নয়; বর্ণনার মাধ্যমেও পরিচালিত হয়। গণমাধ্যম এখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গণমাধ্যম একরৈখিক নয়। এর মালিকানা, অর্থায়ন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ ভিন্ন। ফলে একই ঘটনাকে বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যা এক জায়গায় ‘নিরাপত্তা’ হিসেবে বর্ণিত হয়, অন্য জায়গায় সেটি ‘দখল’ হিসেবে দেখা হতে পারে; যা এক প্রেক্ষাপটে ‘আত্মরক্ষা’, অন্য প্রেক্ষাপটে ‘আগ্রাসন’। এটি বিভিন্ন স্বার্থের সংঘর্ষ এবং বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে অসম প্রবেশাধিকারের প্রতিফলন।
পুঁজিবাদ, বৈষম্য ও পরিবেশগত সংকট
ভূ-রাজনীতির বাইরে আরেকটি গভীর সংকট রয়েছে–বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব।
প্রধান ধারার পুঁজিবাদ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও বিপুল সম্পদ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি তৈরি করেছে গভীর বৈষম্য, পরিবেশগত ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দ্রুততর জলবায়ু বিষয়ক অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এগুলো তাত্ত্বিক নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা– বন্যা, বাস্তুচ্যুতি, সম্পদের চাপ এবং পরিবেশগত পরিবর্তন। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, সীমাহীন প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা কি সীমিত সম্পদের একটি গ্রহের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে?
অর্থহীনতার সংকট ও আধ্যাত্মিক বিচ্ছিন্নতা
রাজনৈতিক ও পরিবেশগত অস্থিরতার পাশাপাশি আরেকটি নীরব সংকট রয়েছে– অর্থের সংকট।
আধুনিক বিশ্বে উৎপাদন, ভোগ ও প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এতে মানুষের সঙ্গে সমাজ, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এখন নতুন করে একটি অনুসন্ধান শুরু হয়েছে– আধ্যাত্মিক শিকড়, নৈতিক কাঠামো ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিকে ফিরে যাওয়ার। এটি অতীতে ফিরে যাওয়া নয়; ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা। বহু-মেরু ভবিষ্যতের পথে বিশ্বে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা কোনো একক বিপ্লব নয়, বরং ক্ষমতার ধীরে ধীরে পুনর্বণ্টন।
বহু-মেরু বিশ্ব মানে কেবল একটি শক্তির পরিবর্তে আরেকটি শক্তির আধিপত্য নয়। বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কোনো একক কেন্দ্র পুরো বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।
একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়সংগত বহু-মেরু বিশ্ব গড়তে প্রয়োজন প্রকৃত সার্বভৌমত্ব; নির্ভরশীলতার কাঠামো হ্রাস; আরও ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবজীবনের সুরক্ষা।
উপসংহার
গ্লোবাল সাউথের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময় একই সঙ্গে অনিশ্চিত ও সম্ভাবনাময়। দীর্ঘদিনের কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়ছে। যেসব কণ্ঠ একসময় প্রান্তিক ছিল, তারা এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে। কিন্তু সামনের চ্যালেঞ্জ নিছক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং সেই পরিবর্তনকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা। সত্যিকারের বহু-মেরু বিশ্ব অবিরাম সংঘাতের ওপর দাঁড়াতে পারে না। এটি গড়ে উঠতে হবে এই স্বীকৃতির ওপর– প্রত্যেক মানুষের জীবন সর্বত্র ও সমানভাবে মূল্যবান। সেই দিগন্ত এখন কেবল কল্পনা নয়, ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে উঠছে।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী, সমাজকর্মী
- বিষয় :
- আনুশেহ আনাদিল
