ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পহেলা বৈশাখ

বাঙালি সংস্কৃতি কে বাঁচাবে!

বাঙালি সংস্কৃতি কে বাঁচাবে!
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমার সেই বন্ধুর আন্তরিকতা তো আমার মনে হয় মর্মস্পর্শী, পহেলা বৈশাখে যিনি প্রথমে পাঞ্জাবি, পরে পাজামা এবং সব শেষে ওই দুয়ের একত্র অনুরোধে খাঁটি বাঙালি, তড়িঘড়ি করে স্যান্ডেল কিনেছেন এক জোড়া। পেয়েছেন কিনা, জানি না। তবে বাজারে গিয়ে মাছ এবং দইও তাঁর কিনবার কথা। ‘ওরে তোরা বাঙালি হ’। ‘মনে-প্রাণে বাঙালি হ’। কিন্তু এ তো এক দিনের ব্যাপার হলো; বাকি দিনে? বাকি ৩৬৪ দিন যে তিনি নির্বিশেষ অবাঙালি হয়ে যাবেন– সে-কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে দুঃখ দেওয়াটা কি অতি বড় নরাধমের কাজ হবে না? না, আমি তা দেব না। আমি নগদ নেব হাত পেতে যা পাই। বলব, বাকির খাতায় শূন্য থাক। খুব ভালো ভাই, এই এক দিনের জন্য হলেও বাঙালি হওয়া। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

কিন্তু যে যা-ই বলুন, বাঙালি হওয়া সহজ নয় এই খরা ও উচ্চমূল্যের দিনে। জামা-কাপড়-জুতো-দই সবকিছুরই দাম চড়েছে। মাছ তো উধাও বাজার থেকে। আরও কঠিন, নির্মম, নৈর্ব্যক্তিক যে সত্য সে হলো এই, বছরের বাকি ৩৬৪ দিন বাঙালি সাজতে গেলে মনে হবে ন্যাকামি করছি; প্রশ্রয় দিচ্ছি কৃত্রিমতার; আশ্রয় নিয়েছি অ্যাফেকটেশনের। একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না-করে বাংলা বলার ধনুর্ভঙ্গ পণের মতোই কৃত্রিম মনে হবে ব্যাপারটা; মনে হবে চালিয়াতি করছি। উদ্রেক করবে হয়তো পরিহাস-চিক্কণ হাসির। খাঁটি বাংলা ভাষার যা দশা, খাঁটি বাঙালিয়ানার সেই একই দশা, এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু কেবল পোশাকে বাঙালি হওয়া, সে তো পোশাকি বাঙালিই হওয়া কেবল; সে আমাদের কত দূরই-বা নিয়ে যাবে? যত দূরই নিয়ে যাক, সে নিজেই তো যাচ্ছে না। আর তারা? তারা যারা বেশুমার, অগুনতি, তারা ওই পোশাকি বাঙালিই বা হবে কী করে? তাদের তো কোনো পোশাকই নেই গায়ে; জুতা তারা পায়ে দেয়নি কখনও; খেয়ে থাকলেও থাকতে পারে। পাঞ্জাবি-পাজামা তো মস্ত বিলাসিতা তাদের জন্য; লুঙ্গি-গামছা জোটানোই অসম্ভব যাদের পক্ষে।

তাদের কথা বাদ থাক। আমরা যারা পোশাক পরি, মাঝে মাঝে মাছ খাই এবং কালেভদ্রে মিষ্টির দোকানে যাই, তাদের কথাই ধরা যাক। আমরা ভেতরে তেমন আর বাঙালি নই বলেই এমনকি পোশাকে বাঙালি হওয়াটাও কঠিন হয়। হলে কৃত্রিম মনে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে হাসির উদ্রেক করে। কিন্তু ভেতরে বাঙালি, ওই জিনিসটাই-বা কী? বাঙালির কোথায় বৈশিষ্ট্য? কোথায় সে স্বতন্ত্র, অন্যসব জাতি থেকে?
বিদেশিরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছে। কেউ বলেছে প্রতারক, কেউ বলেছে গল্পবাজ; কারও ধারণা অলস। না, আমরা এসব হিংসুটের কথায় মোটেই কর্ণপাত করব না; উড়িয়ে দেব একটা বড় ফুঁ দিয়ে। ভেতর থেকে, আমাদেরই কেউ যদি ধৃষ্টতা দেখায় এসব কথা বলবার, তাকেও খাঁটি জাতীয় বেইমান বলেই চিহ্নিত করব। আমরা বলব, বাঙালি কে– সেটা আর আলাদা করে চিনিয়ে দেবার দরকার নেই। বাঙালিকে চেনা যাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সংযোগ দেখে। সে-ই বাঙালি, বাঙালি ঐতিহ্যের মধ্যে যার অবস্থান। কিন্তু সেই ঐতিহ্যটা কী? কেননা, আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যে একদিকে আছে দাসত্ব, অন্যদিকে বিদ্রোহ। সত্য দুটোই। কোনটাকে নেব? বলতে ভালো, বলা সহজ এবং বলা অতিঅবশ্যি বাঞ্ছনীয় যে, আমরা নেব আলোর দিকটা। আমরা বাঙালি হব সাহসে, প্রতিরোধে, বিদ্রোহে, বিপ্লবে। আমরা আমাদের ঐতিহ্যের সামন্তবাদী সামান্যতা ও সংকীর্ণতার দিকটাকে সযত্নে ও সবলে প্রত্যাখ্যান করে দূরে সরিয়ে তার উষ্ণ গণতান্ত্রিক ও জীবনঘনিষ্ঠতার দিকটাকে নিয়ে যাব এগিয়ে। তাকে বিকশিত করব; কচি ও কাঁচাকে ডাঁটো করে তুলব; পাথেয় করে তুলব ইতিহাসের চড়াই-উতরাই ভেঙে আমাদের ক্রমান্বিত অগ্রযাত্রার।

আমরা কী দিয়েই-বা রক্ষা করব আমাদের বাঙালিত্ব? পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে? পায়ের স্যান্ডেল দেখিয়ে? নাকি বলব যে, আমি ঘৃণা করি অস্ত্রশস্ত্র? নিজেই অস্ত্র হয়ে উঠব হানা দেয় যদি দুর্বৃত্ত? দুর্বৃত্ত কি তাতে ভয় পাবে? হুঙ্কারের এই অস্ত্র এবং জামা-জুতোর ওই ঢাল দেখে? বাঁধব কি তাকে শাড়ির লাল পাড় দিয়ে? কার সঙ্গে লড়ছি আমরা? লড়ছি কি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে!
বাঙালি বাঙালিকে না বাঁচালে কে বাঁচাবে? এ অত্যন্ত সত্য কথা। খাঁটি কথা। কিন্তু বাঙালি যে বাঙালিকে বাঁচাবে, তার ভরসা কোথায়? একটি চাকরি খালি হলে যেখানে প্রার্থী এসে হাজির হয় হাজার হাজার, সেখানে ভরসা করার কি কারণ আছে খুব একটা? প্রত্যেকেই তো মনে হয় শত্রু প্রত্যেকের।

হ্যাঁ, পারবে। অবশ্যই পারবে বাঙালি বাঙালিকে বাঁচাতে, যদি ঐক্যবদ্ধ হয় সে। মুশকিল তো সেইখানেই। ঐক্যবদ্ধ যে হবে, তার ভিত্তিটা কোথায়? পুঁজিবাদ মানুষকে ভাগ করে দিয়েছে শোষক ও শোষিতে। এই শোষক ও শোষিত এখন এক হবে কী করে? কী করেই-বা তারা এক ভাষা বলবে? জামা-কাপড় পরবে একই ধরনের? ঐক্যের গোড়া তো ওইখানেই কাটা আসলে। আজ এই অনৈক্য বাড়ছে। কেননা, ধনবৈষম্য বাড়ছে সমাজে। শোষণ আরও তীব্র হচ্ছে; শোষিত আরও দরিদ্র হচ্ছে। বাঙালিত্বকে রক্ষা করতে হলে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে দেশের সব মানুষকে। আর সেই ঐক্যের জন্য প্রয়োজন হবে নতুন এক সমাজ গঠনের। বাঙালিত্ব রক্ষার লড়াইকে তাই অবশ্যই হতে হবে পুঁজিবাদবিরোধী লড়াই। পুঁজিবাদকে রক্ষা করছে সাম্রাজ্যবাদ। এ লড়াই তাই অতিঅবশ্যি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।

বাঙালির নববর্ষ কখনোই সকল বাঙালির কাছে একভাবে আসেনি। কারও কাছে এসেছে খরা হয়ে; খাজনা দেবার সময় হিসেবে; মহাজনের সুদরূপে। কারও কাছে এসেছে উৎসব হিসেবে। কেননা, ওই যে ধনবৈষম্য ও শোষণ; সে তখনও সত্য ছিল, এখনও তা সত্য। একাত্তরে স্বাধীন হলাম আমরা, কিন্তু মানুষে-মানুষে ব্যবধানটা দূর করতে পারলাম না। এ নিয়ে যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না-হই, তবে দুশ্চিন্তা করব কী নিয়ে? বাঙালিত্ব কি শেষ পর্যন্ত কেবল কথাতেই পাওয়া যাবে? খুঁজে পাওয়া যাবে না কাজে? 
প্রশ্নের মধ্যেই মনে হয় জবাব আছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×