ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

কার্ডের পাশাপাশি কৃষকের অন্য সমস্যারও সমাধান জরুরি

কার্ডের পাশাপাশি কৃষকের অন্য সমস্যারও সমাধান জরুরি
×

মঙ্গলবার কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী

ইফতেখারুল ইসলাম 

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:২২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:২৩

সম্প্রতি সরকার ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি থেকে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের ব্যবস্থা নেয়। শুধু তাই নয়, সরকার ইতিমধ্যে কৃষির উন্নয়নে ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনায় বসেছে। কিন্তু আমরা অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কিভাবে কার্ড উদ্যোগ স্রেফ প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়েছে; তেমন ফল দেয়নি। তাই এবারের কার্ড বিতরণ নিয়েও যথেষ্ট সংশয়ের উদ্রেক হওয়া অযৌক্তিক নয়। তাছাড়া দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে কেবল দুই/তিন হাজার টাকা দিলেই তাদের ভাগ্য বদলে যাবে না, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির পুনর্গঠন জরুরি। 

কৃষি ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণাটি বেশ বিস্তৃত। বীজ বপন থেকে শুরু করে, বীজের দাম, বাজারে যথাযথভাবে কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষিযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় টোলগ্রহণসহ বহু প্রক্রিয়ার সঙ্গে কৃষির রাজনৈতিক অর্থনীতি যুক্ত রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাণিজ্য। দেশের কৃষিখাতে অগ্রগতি আনা এবং কৃষকের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হলে উল্লেখিত বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান জরুরি। তাই সরকারের গৃহীত কৃষক কার্ড সমস্যার গোড়ার সমাধান দিবে বলে মনে হয় না। 

সমকালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৭ সালে ‘কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড’ চালু করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সহজে সার-বীজসহ উপকরণ দেওয়া; কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই কার্ডের কার্যকারিতা নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছিল। পরে ২০০৯ সালে সরকার কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তারপর বৃহৎ আকারে ডিজিটাল কৃষি পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ২০২২ সালে সরকার ‘স্মার্ট কৃষি কার্ড ও ডিজিটাল কৃষি (পাইলট)’ নামে ১০৭ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। এর লক্ষ্য ছিল এক কোটি ৬২ লাখ কৃষককে স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা, কিন্তু প্রকল্পটি এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। এতে পুরো অর্থ কোথায় গেছে, তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। 

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরেকটি কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৯ কৃষককে ‘কৃষি উপকরণ কার্ড’ সরবরাহ করে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই কার্ড কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়েও মিশ্র অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। একই বছর ‘পার্টনার প্রকল্প’ নামে আরেকটি বড় প্রকল্প গৃহীত হয়। 

সমকালের প্রতিবেদন মতে, ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করে এবং ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ কৃষক পরিবারকে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ প্রদান। এ জন্য আলাদা করে প্রায় ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু আড়াই বছর পার হলেও প্রকৃত কৃষকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত হয়নি। 

এগুলো হচ্ছে আমাদের অতীতের বাস্তবতা। সুতরাং বর্তমান সরকার কতটা কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা সময়ই বলে দিবে। কৃষক কার্ড বলে আলাদা প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে কৃষিক্ষেত্রের বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

কৃষক কার্ডের মতো নতুন প্রকল্প চালু করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, তবে কৃষকদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো দেখা দরকার। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদন খরচের উঠানো, সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতায় হাত দিতে হবে।

কৃষক কার্ড একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু একে কেন্দ্র করে মূল সমস্যা উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতিনির্ধারণ থাকলে কৃষিক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×