ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কৃষক কার্ড

কৃষি হোক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু

কৃষি হোক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু
×

রাজু আলীম

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ও কৃষি উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। তাঁর কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও কৃষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের রোডম্যাপ তুলে ধরেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ারও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন শাইখ সিরাজ। সে সময়টি যদিও দেশে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশকেই প্রাধান্য দেওয়ার মতো ছিল; কিন্তু তাঁর সরকার কৃষিকেও দিয়েছিল সমান গুরুত্ব। কৃষিভিত্তিক সমাজকে এগিয়ে নিতে নেওয়া হয়েছিল বেশ কিছু উদ্যোগ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটিকেও সে সময় সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রেখেছিল; যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নেন তিনি। সে সময় সরকার কৃষিকে ধান-পাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকেও কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেন; যার ধারাবাহিকতায় মৎস্য পক্ষ, পোলট্রি মেলা, যুবমেলা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; যা মাটি ও মানুষে নিয়মিতই প্রচারিত হয়।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রের জায়গা থেকে যদি দেখি কৃষি নিয়ে ভাবনা, পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের জায়গাটি আসে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে। সেই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কৃষি ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও পরিকল্পনায় একটি বিষয় স্পষ্ট–কৃষিকে আর শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কৃষিকে দেখতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে। যেখানে কৃষক শুধু উৎপাদক নন, তিনি উদ্যোক্তা। যেখানে কৃষি মানে শুধু ধান বা গম নয়; বরং মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি–সবকিছুর সমন্বয়।

পহেলা বৈশাখের মতো একটি দিনে কৃষক কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত–এটি প্রতীকী হলেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশাখ মানেই কৃষির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। ফসলের হিসাব, নতুন বছরের শুরু, জমির নতুন চক্র–সবকিছুই এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে।

এই কৃষক কার্ড শুধু একটি কার্ড নয়; এটি একটি স্বীকৃতি। একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি–যে কৃষক আছে, তার পরিচয় আছে, তার অধিকার আছে। প্রায় দুই কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চিন্তা–এটি ছোট বিষয় নয়।

তবে বাস্তবতা কঠিন। আজও বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষক প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পান না। তারা যান মহাজনের কাছে, এনজিওর কাছে, আত্মীয়ের কাছে। সুদের বোঝা নিয়ে তারা উৎপাদন শুরু করেন, আর শেষ পর্যন্ত লাভের বড় অংশ চলে যায় অন্যের হাতে।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করেছে– এটি স্বস্তির; কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন একটি টেকসই কৃষি অর্থনীতি, যেখানে কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পাবেন, প্রযুক্তি পাবেন, বাজার পাবেন।

একজন কৃষক যখন টেলিভিশনে দেখেন–তাঁর মতোই আরেকজন কৃষক নতুন পদ্ধতিতে সফল হয়েছেন–তখন তিনি অনুপ্রাণিত হন। তখন তিনি ঝুঁকি নিতে চান। তখনই পরিবর্তন শুরু হয়।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ তাই শুধু সরকারের হাতে নয়, শুধু গণমাধ্যমের হাতেও নয়। এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। কৃষক কার্ড, ভর্তুকি, ঋণ, প্রযুক্তি–এসব প্রয়োজনীয়। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যেখানে কৃষিকে সম্মান করা হবে। কৃষককে মর্যাদা দেওয়া হবে।

আমরা অনেক সময় শহর থেকে কৃষিকে দেখি– সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে, উৎপাদনে। কিন্তু শাইখ সিরাজ আমাদের শিখিয়েছেন–কৃষি আসলে মানুষের গল্প। বেঁচে থাকার গল্প। সংগ্রামের গল্প। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সেই গল্পকে বুঝে, সেই গল্পকে নীতিতে রূপ দিতে পারে–তবেই পরিবর্তন সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের কৃষি নতুন এক পথে এগোতে পারে। যেখানে কৃষক শুধু টিকে থাকবেন না, তিনি এগিয়ে যাবেন। তিনি গর্বের সঙ্গে বলবেন–আমি কৃষক।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সেখানেই এসে দাঁড়ায়–আমরা কি সত্যিই কৃষিকে সেই জায়গায় নিতে পারব? হয়তো এক দিন আমরা সত্যিই দেখব–কৃষক আর অবহেলার প্রতীক নন। তিনি হবেন উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু।

রাজু আলীম: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×