ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আস্ফালনের আড়ালে ট্রাম্প শান্তিচুক্তি করতে মরিয়া

আস্ফালনের আড়ালে ট্রাম্প শান্তিচুক্তি করতে মরিয়া
×

ছবি: সংগৃহীত

রাজন মেনন

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:০৫

সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের অবসানে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সভার ব্যর্থতা মোটেই আশ্চর্যজনক ছিল না। কারণ ওয়াশিংটনের ১৫-দফা প্রস্তাব এবং তেহরানের ১০-দফা প্রস্তাবের মধ্যে ছিল সুস্পষ্ট পার্থক্য। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ)-এর মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উপর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই সমঝোতা করতে লেগেছিল দুই বছরেরও বেশি সময় এবং এর শিকড় ছিল প্রকৃতপক্ষে ২০০৩ সালে। মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে পুরো একদিনেরও কম সময় কাটিয়েছেন, যেখানে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল পারমাণবিকসহ অন্যান্য বিষয়। 

ব্যর্থতার ব্যাপারে ভ্যান্সের ব্যাখ্যাটিই ছিল আশ্চর্যজনক। তার মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন পক্ষ শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থানে ছিল না। কারণ ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কার্যকরকালে ইরান তার অবস্থানে অটল ছিল। কিন্তু ভ্যান্স তার বস ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই মনে করতেন যে, ইরানীরা পরাজিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নমনীয় হতে হবে না।

ভ্যান্সের প্রত্যাবর্তনের পর ট্রাম্প পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন। তিনি নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের বন্দরে যাতায়াতকারী সমস্ত জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেন। সাধারণত অবরোধ হল যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ। সুতরাং পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বেশ নাজুক, যা স্পষ্ট। ইরান তার পাল্টা পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ হতে পারে। যেমন– অবরোধের জবাবে মার্কিন-সমর্থিত উপসাগরীয় জাহাজগুলোতে ইরান কর্তৃক হামলা চালানো, যার হুমকি ইতোমধ্যেই দেশটি দিয়েছে। এর ফলে তেল, ডিজেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ট্রাম্প হয়তো ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরু করবেন এবং সম্ভবত ইসরায়েলও সে পথে হাঁটবে। পুরো মাত্রায় যুদ্ধ আবার ফিরে আসবে। এ কারণে আলোচনা পুনরায় শুরু করা দরকার। 

তাহলে এরপর কী? সৌভাগ্যবশত, কোনো পক্ষই সামনে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়নি। তাছাড়া মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও মিশর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে পর্দার আড়ালে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নতুন করে যুদ্ধ এড়ানোর পেছনে তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়েরই বোঝাপড়া রয়েছে। 

ট্রাম্প জানেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার দলের এই সুপরিকল্পিত আশ্বাস মেনে নিয়ে তিনি যে গর্ত খুঁড়েছেন তাতে যুদ্ধ আরও তীব্র হবে। আশ্বাসটি ছিল যে, ইরানের ওপর বিনা উসকানিতে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটিতে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন আসন্ন। ইরান একটি ভয়াবহ আক্রমণ প্রতিহত করেছে, কিন্তু যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে দেশটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কেবল বাড়তেই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে পুনর্গঠন আরও কঠিন হয়ে উঠবে এবং সেখান থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে, যা অতীতে জনগণের মধ্যে অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছিল। 

এই পরিস্থিতি নতুন করে কূটনীতি শুরু করার জন্য ইতিবাচক, কিন্তু তার জন্য দরকার একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে এখনও বিতর্ক চলমান, যদিও আমার সম্ভাব্য এই প্রস্তাবিত কাঠামোতে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত না হলেও বিবাদের মূল বিষয়গুলো এখানে যুক্ত। 

আমার কাঠামোতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার জন্য একটি লিখিত অঙ্গীকার করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনের নির্দেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ইরানের উচিত তার যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণের দাবি প্রত্যাহার করা, যা দিতে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই রাজি হবে না। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে তুলে নেবে এবং ইরানের জব্দকৃত সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দিবে কিংবা মুক্ত করা হবে।

পরিশেষে, যেকোনো পরিকল্পনা গৃহীত হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে। প্রথমত, শুধু ইরানকে নয়, ওয়াশিংটনকেও ছাড় দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পকে তাঁর ২২ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়াতে হবে এবং তার মেনে নিতে হবে এই ধরনের জটিল আলোচনায় সময় দরকার। তৃতীয়ত, ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলা সবকিছু ভেস্তে দিতে পারে। আলোচনাকালে ট্রাম্পের উচিত নেতানিয়াহুকে সংযত রাখা। 

রাজন মেনন: সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কের পাওয়েল স্কুলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×