ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভূত ও ভবিষ্যৎ

জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভূত ও ভবিষ্যৎ
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:১২

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনীতি পূর্ববঙ্গের সব বাঙালিকে এক করেছিল (স্বাধীনতাবিরোধীদের বাদ দিয়ে)। যে জন্য তখন জাতীয় লক্ষ্য যে সমাজতন্ত্র হবে– এটা খুব স্বাভাবিক ও সর্বজনস্বীকৃত সিদ্ধান্ত ছিল। একই কারণে সংবিধানের মূলনীতিতেও সমাজতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু আজ যে সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র বাদ পড়তে চলেছে, তার কারণটা তাত্ত্বিক নয়, বস্তুগত বটে। যে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সে সময় যে দলের অন্যতম মূলনীতি ছিল সমাজতন্ত্র, সে দলই কি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে? এখনকার শাসকের মতোই তাদেরও আদর্শ ছিল সমগ্র জনগণের স্বার্থ রক্ষা নয়; নিজেদের স্বার্থকে পুষ্ট করা শুধু। তারা সমাজতন্ত্রী হবে কেন? কার ভয়ে, কোন দুঃখে!

আওয়ামী লীগ ছিল উঠতি মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান আমলে এই শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে জনগণের স্বার্থের কোনো বিরোধ বাধেনি; তখন তাই সমাজতন্ত্রের আওয়াজ চলে এসেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের যে অংশ ধনী হয়েছে, তারা সমাজতন্ত্রের কথা বলবে কোন কারণে? বিএনপির পক্ষে রাষ্ট্রীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তি সাধন যেমন স্বাভাবিক; আওয়ামী লীগের পক্ষেও তেমনি দলীয় কর্মসূচি থেকে সমাজতন্ত্রকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা; বিরোধিতা পেটে ছিল, তা মুখে চলে এসেছে, এই যা। আমাদের দুই জাতীয়তাবাদী দলই তাই অজাতীয়। কেউই বাংলাদেশের বাঙালিদের স্বার্থ দেখবে না। দেখবে কেবল নিজেদের স্বার্থ।

তাহলে বাঙালির কী হবে? তার স্বার্থ কে দেখবে? পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির অবস্থা এখন ভালো নয়। হিন্দির অত্যাচারে। টেলিভিশন সুযোগ হয়ে এসেছে– যেমন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মধ্যবিত্তের জন্য তেমনি উত্তর ভারতীয় হিন্দির জন্যও। বাঙালি মধ্যবিত্ত বিনোদন লাভ করছে ঠিকই, কিন্তু ওদিকে হিন্দি আরও একটি পথ পেয়ে গেছে, মধ্যবিত্তের একেবারে অন্তঃপুরে প্রবেশের। বাঙালির জন্য গর্বের বস্তু তার ভাষা। সেই বাংলা ভাষা ভারতে কেবল যে একটি প্রাদেশিক ভাষা, তা নয়। একটি কোণঠাসা ভাষাও বটে। কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এখন বাঙালির কর্তৃত্ব নেই, সেখানে অবাঙালিদেরই দৌরাত্ম্য। এই সহজ কারণে যে, টাকার থলি এখন অবাঙালিদের করতলেই থাকে, বাঙালির হাতে না গিয়ে। এয়ারকন্ডিশন্ড মার্কেটে হেমন্তের গানের মাহাত্ম্য শিখ দোকানদারের কাছ থেকেই শুনতে হয়; বাঙালি ছেলেটি কর্মচারী হিসেবে ক্যাসেট এগিয়ে-পিছিয়ে দেয় মাত্র। কলকাতার জন্য একটি গৌরবের বিষয় ছিল তার চলচ্চিত্র। সে বিশেষ গৌরব এখন আর নেই। এখন আর কোনো সুচিত্রা-উত্তমের কথা শোনা যায় না। অদূর ভবিষ্যতে মনে হয় যাবেও না। ব্যবসায়ী পুঁজির সেবক হয়ে বোম্বের ধুমধাড়াক্কা ভারতের সর্বত্র যেমন রাজত্ব করছে, পশ্চিমবঙ্গেও তেমনি একাধিপত্য কায়েম করে বসে রয়েছে। তাকে হটায় কে? কলকাতার পার্শ্ববর্তী গঙ্গা এখন একটি আবর্জনাবাহী নদী।

সব মিলিয়ে সত্য এই যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রেও বেশ বিপন্ন। এ কথাটা সেখানকার সচেতন নাগরিকরাও বলেন, বিশেষ করে যখন তারা বাংলাদেশে আসেন। কলকাতায় তারা তা বলেন বলে মনে হয় না। কেননা, কলকাতায় এমন কথার বিশেষ মূল্য নেই।

তা ভারতীয় বাঙালিরা যা করার তারাই করবে– যেভাবে পারে, যতটা পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কী করব? বাংলাদেশে বাঙালির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য কে কতটা করবে এবং কী করবে?

বাঙালিকে বাঁচাতে হলে মূল যে কাজটি করতে হবে তা হলো বিদ্যমান আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করা। বৈষম্য দূর করার জন্য চাই পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের এবং সামন্তবাদী অবশেষগুলোর অবসান ঘটানোর জন্য সংঘবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করা। এটা তথাকথিত জাতীয়তাবাদীরা করবে না। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরা তো নয়ই; বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও নয়।

প্রসঙ্গত, অতীতের জাতীয়তাবাদীরা বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ নেয়নি। ব্রিটিশ আমলে তারা যখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছে তখন সামন্তবাদকে শত্রু মনে করেনি এবং ক্ষেত্রবিশেষ তাকে প্রশ্রয়ই দিয়েছে। বহু বছর আগে, এই শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রমথ চৌধুরী ‘রায়তের কথা’ নামে ছোট একটি বই লিখেছিলেন। তাতে তাঁর বক্তব্য যে বৈপ্লবিক ছিল, তা নয়; মোটামুটি সংস্কারবাদীই ছিল। কিন্তু তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন ‘ন্যাশনালিস্ট ওরফে এক্সট্রেমিস্টরা তো চটে একেবারে আগুন। তাদের পক্ষ থেকে শ্রীযুক্ত ব্যোমকেশ চক্রবর্তী মহাশয় এক বার্তা বের করেছেন, তার মোদ্দা কথা হলো, রায়তদের কোনো অধিকার দেওয়া হবে না, অন্তত এখন তো নয়ই। এখন তাদের লিবার্টি, ইকুয়েলিটির মন্ত্র জপ করতে শেখানো যাক, পরে দূর ভবিষ্যতে তাদের কোনোরূপ অধিকার দেওয়া হবে কিনা তা বিবেচনা করা যাবে।’ 

ওদিকে আবার সত্য ছিল সেটাও যে, ভারতীয় কংগ্রেস সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করতে চাইলেও একটা বিশেষ সম্প্রদায়েরই মুখপাত্রে পরিণত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত। আর মুসলিম লীগের তো জন্মই হয়েছিল তার নিজের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানরূপে। ফলত এই দুই জাতীয়তাবাদী দল রাজনীতি করতে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ করবে কী, বঙ্গ তথা ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিতই করেছে। চিত্তরঞ্জন দাশ চেষ্টা করেছিলেন বাঙালির রাজনীতিকে আলাদা করে রাখবেন ভারতীয় রাজনীতি থেকে। তাঁর মৃত্যুর পর ওই চেষ্টা করার মতো আর কেউ রইলেন না।

বাংলাদেশে বাঙালির জন্য ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতা জাতীয়তাবাদী দল দুটির কাজের ওপর নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে সমাজ-পরিবর্তনে বিশ্বাসী মানুষ, অর্থাৎ যথার্থ অর্থে জাতীয়তাবাদীরা কী করেন তার ওপরই। গোলাম আযমকে বিচার করার জন্য যে গণআদালত বসেছিল, তার ব্যাপারে উদ্যোগ দলবহির্ভূত বুদ্ধিজীবীদেরই নিতে হয়েছে এবং তার সমাবেশে মানুষের যোগদান স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। এর তাৎপর্য লক্ষ্য করার বিষয়। নেতৃত্ব ওই অংশকেই দিতে হবে। কিন্তু কোনো আন্দোলনই স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর নির্ভরশীল হয়ে দীর্ঘস্থায়ী কিংবা সুদূরপ্রসারী হতে পারে না। তাকে সংগঠিত হতে হয়। তাই প্রয়োজন হবে সুগঠিত ও স্থিরলক্ষ্যাভিসারী আন্দোলনের। প্রয়োজন হবে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে জনগণের ঐক্যের। লক্ষ্য হবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়া, যে লক্ষ্য অর্জনের মৌলিক শর্ত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×