উচ্চারণের বিপরীতে
পরস্পরকে নির্মূল করবার রাজনীতি আর কতদিন
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৩ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শনিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত সম্মেলনে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান বলেছেন, ‘ডান্ডা মেরে স্থিতিশীলতা আনা যায় না। শেখ হাসিনাও তাঁর শাসনামলে সব দলকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলেছিলেন’ (সমকাল, ১৯ এপ্রিল, ২৬)। তিনি আরও বলেছেন, ‘যখন তাদের (জনগণের) ধৈর্য সীমার বাইরে চলে যায়, তখন তারা রাস্তায়ও নেমে আসে।’
প্রায় দুই বছর আগে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে মানুষের অভূতপূর্ব জাগরণের পরও রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা সোনার পাথরবাটি হয়েই আছে। সম্ভবত তা দেখেই তিনি এমন সতর্কতা সংকেত দিলেন।
বিশেষ করে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক শাসন শুরু হলে দুই প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে পরস্পরকে নির্মূল করবার তৎপরতা ক্রমশ বাড়াতে থাকে। তারই পরিণতি ছিল আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসন, যার বিরুদ্ধে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিশেষত ডানপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয় এবং একাধারে আইনের শাসন, নৈতিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নির্বিকারত্ব ও অবহেলায় দেশ গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াত; তাদের জোটসঙ্গী হয়ে সংসদে আসীন হয় এনসিপি।
গণঅভ্যুত্থানে হত্যা-নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীদের ফৌজদারি আইনে শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মানবাধিকারবিরোধী বিচারের ট্রাইব্যুনালে চব্বিশের হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করে। এতে যুদ্ধাপরাধের বিচার যেমন বন্ধ ও অর্থহীন হয়ে ওঠে, তেমনি চব্বিশের অপরাধীদের বিচারও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায় না। শেষোক্তদের বিচার প্রশ্নে সরকারের শৈথিল্য ও অকর্মণ্যতার মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশের আনাচে কানাচে বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হয়। জেলখানাগুলো ভরে ওঠে আওয়ামী লীগের কর্মী-নেতায়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও এ থেকে রেহাই পাননি। যাদের অনেকে সুনির্দিষ্ট ও সঠিকভাবে দায়ের করা মামলা ছাড়াই মাসের পর মাস জেলে আছেন। সিভিল সোসাইটি কিংবা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে জেলে বন্দি এই অগণিত মানুষের মুক্তির দাবি কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা সম্পর্কে আপত্তি জানালে বিশেষ রাজনৈতিক মহল থেকে বলা হয়েছে, যারা এসব দাবি তুলছে, তারা গণহত্যাকারীদের দোসর। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে ‘সফট’ আওয়ামী লীগার হিসেবে। এমনকি ভারতীয় দোসর বলেও তারা অভিহিত হয়েছেন।
০২.
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক আবহের আকাঙ্ক্ষা বহু বছর যাবৎ এ দেশে অধরা। আওয়ামী লীগ তার সর্বশেষ তিন নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে পুতুল বিরোধী দল বানিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সবাইকে অচ্ছুত সাব্যস্ত করে নির্বাচনের বাইরে রাখে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পরিস্থিতির বদল হবার প্রতিশ্রুতি থাকলেও একই ধারাবাহিকতার দেখা মেলে। এবার আওয়ামী লীগকেই অচ্ছুত বানিয়ে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়, যদিও সর্বশেষ সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনসমূহে দলটি কমবেশি ৪০ শতাংশ করে ভোট পায়। এনসিপির নেতাকর্মীদের দুদিনের এক স্বল্পমেয়াদি আন্দোলনে গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। নবনির্বাচিত সংসদে সম্প্রতি অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করেছে সরকার ও বিরোধী জোট সম্মিলিতভাবে।
অবশ্য সম্প্রতি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলে সকলকে চমকে দিয়েছেন। এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪৪ জন নেতাকর্মীর এনসিপিতে যোগদান উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রোববার নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘ছাত্রদল হোক, ছাত্রশিবির হোক, ছাত্র অধিকার পরিষদ, এমনকি ছাত্রলীগ হোক– কারও সাবেক পরিচয় মুখ্য নয়। তবে ফ্যাসিবাদে অংশগ্রহণকারী, গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী, গণহত্যাকে সমর্থনকারী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, সন্ত্রাসী– এ ধরনের কোনো ব্যক্তি কখনোই এনসিপিতে আসতে বা থাকতে পারবেন না’ (প্রথম আলো, ২০ এপ্রিল, ২৬)।

‘এমনকি ছাত্রলীগ!’– তারও পরিচয় মুখ্য নয়! এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! গত ২০ মাস অবিরাম শুনলাম, ছাত্রলীগ উচ্চারণের অযোগ্য এক শব্দ– এরা ফ্যাসিবাদী, গণহত্যাকারী। এখন তাদের পরিচয় আর মুখ্য নয়। তাহলে ছাত্রলীগের মূল সংগঠন আওয়ামী লীগ পরিচয়ও আর মুখ্য থাকবে কেন? নির্বাচনোত্তর সময়ে নিজেদের সুবিধামতো আকার-আয়তন-পরিসর বাড়িয়ে নেওয়া যাক! এই যদি না হবে তো ফ্যাসিবাদ-হত্যা-নিপীড়নে যারা যুক্ত নয়, তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিষিদ্ধ করা হলো কাদের উৎসাহ ও তৎপরতায়! এটা কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার উদ্দেশ্যে প্রবল প্রতিপক্ষকে মাঠের বাইরে রাখবার আওয়ামী লীগ অনুসৃত প্রক্রিয়ার অনুবর্তন বললে অবশ্যই ভুল হবে না। গতকাল যে দলকে ফ্যাসিবাদী-গণহত্যাকারী হিসেবে নিষিদ্ধ করবার অবিরাম দাবি করে গেছেন, আজ সেই দলের সদস্যকে এনসিপি নেতা স্বাগত জানাচ্ছেন। কর্মীদের সমন্বয়ে দল গঠিত হয়, আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ফ্যাসিবাদী-হত্যাকারী, আর তার কর্মীরা অনাঘ্রাতপুষ্প হতে পারেন না। ফ্যাসিবাদী-হত্যাকারী পরিমাপের বাটখারাও এনসিপি নেতারা নিজেদের হাতেই রেখেছেন; হা হতোস্মি!
০৩.
প্রতিপক্ষকে ছলেবলে নির্মূল করবার এই ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। রাজনৈতিক দল এগিয়ে যাবে নিজ আদর্শ, গঠনতন্ত্র, পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক শক্তিতে। সেখানে থাকবে যুক্তি, পরমতসহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের যথাযথ পরিসর। জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রতিটি দলের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। থাকতে হবে উন্নয়নের বাস্তব পথরেখা। এসবের সঠিক চর্চার অভাব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অন্তঃসারশূন্য করে তুলেছে।
সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধির বদলে রাজনীতিতে বিরোধী মতের যথাযথ পরিসর নিশ্চিত করা তাই জরুরি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ১৫ বছরে বিরোধী মতের কোনো স্থান ছিল না। রাজনীতি ছিল ভারসাম্যহীন। বর্তমানে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত ও এনসিপিকেই যদি বিএনপি বোঝাতে চায়, সেটিও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে না। এনসিপি নতুন দল, এখনও দেশের মানুষের কোনো প্রয়োজনে তাদের সেভাবে সমুখ সমরে পরীক্ষা দিতে হয়নি। জামায়াতে ইসলামী পুরোনো দল হলেও এ দেশের কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন অথবা ইস্যুভিত্তিক কোনো প্রয়োজনেই জামায়াতকে নেতৃত্বের আসনে কোনোদিন দেখা যায়নি। অন্য অনেকের পাশে জামায়াতও উপস্থিত ছিল বা আছে; এই যখন সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অতীত ট্র্যাক রেকর্ড; তখন মুখ্য রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রাসঙ্গিকতা সমাজে থাকবে। সে ক্ষেত্রে দলটির নেতাকর্মী যারা অপরাধী নন, তাদের ওপর বিধি-নিষেধ থাকবার কোনো কারণ নেই।
রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক যুক্তিমুখর ও প্রসন্ন সহাবস্থান সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে হবে আদর্শভিত্তিক ও সাংগঠনিক শক্তিতে, অন্য কোনো উপায় অবলম্বন আপাত সাফল্যের মুখ দেখলেও তা রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদি ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায় না। সরকার সমর্থিত ফ্রিডম পার্টি বা জাতীয় পার্টিই তার উদাহরণ।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
