ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

রঘু রাই যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠেন

রঘু রাই যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠেন
×

আলোকচিত্রী রঘু রাই। ফাইল ছবি

সলিল ত্রিপাঠি

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৪০ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:১১

একজন আলোকচিত্রীর কাছে যুদ্ধের ময়দান আর অন্য জায়গার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, যে কোনো সময় বিপদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে রঘু রাই ভারতীয় সেনাদের প্রথম বাহিনীর সঙ্গে খুলনা সীমান্ত দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেন। পাকিস্তানি বাহিনী তখন রাজধানী ঢাকা রক্ষার জন্য পিছু হটছিল। কিন্তু প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর, পাকিস্তানিরা কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করে। রাই আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার ছবি তুলছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে রাই স্বস্তি পেতে একটি চায়ের দোকান খুঁজে নেন এবং কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর তাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ঠিক যখন রাই চা আর বিস্কুটের অর্ডার দিলেন, একটি গুলি তার পাশ দিয়ে শিস কেটে বেরিয়ে গেল। রাই লিখেছেন, ‘মেজর আমাকে শুয়ে পড়ার জন্য চিৎকার করে বললেন। আমি শুয়ে পড়লাম এবং আরেকটি গুলি আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে দোকানের ভেতরে গেলাম এবং দোকানদারের কাছে জানতে পারলাম যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেললাইনের ঠিক ওপাশেই, মাত্র আধ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।’
একজন আলোকচিত্রীকে ধরা হয় নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক বা সাক্ষী হিসেবে। কিন্তু সেই পাকিস্তানি স্নাইপারের কাছে রাই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, যে কি না বিদেশি সেনাবাহিনীর সাথে তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তিনি ছিলেন একজন সহজ লক্ষ্যবস্তু। তিনি হয়তো রেকর্ড করতে এসেছিলেন, কিন্তু প্রকারান্তরে তিনি এই যুদ্ধেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

দুই সপ্তাহব্যাপী সেই যুদ্ধের সময় রঘু রাই ছবিগুলো তুলেছিলেন। ভারতীয় বাহিনীর ঢাকায় প্রবেশ এবং জেনারেল নিয়াজির বাহিনীকে পরাজিত করা পর্যন্ত দুই সপ্তাহের সেই ছবিগুলো 'নিয়োগী বুকস' থেকে একটি ঝকঝকে ভলিউম আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি বাংলাদেশের বীরত্ব, ভারতের সমর্থন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার এক প্রামাণ্য দলিল।

দীর্ঘদিন এই ছবিগুলো সযত্নে তুলে রাখার পর রাই যেন সেগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। বছর দুয়েক আগে তিনি উত্তেজিত হয়ে তার বন্ধু, বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ফোন করে জানান যে হারিয়ে যাওয়া নেগেটিভগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। এটি ছিল এক বিশাল আবিষ্কার। ২০১১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার ৪০ বছর উদ্‌যাপন করছিল, তখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা প্রজন্মটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল। শহিদুল আলম, যিনি তার সংস্থা 'দৃক'-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায় নথিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজেও তখন দেশি-বিদেশি আলোকচিত্রীদের কাজ নিয়ে 'দ্য বার্থ প্যাঙ্গস অব এ নেশন' বইটি সংকলন করছিলেন। রাইয়ের কিছু ছবি সেই বইটিতেও স্থান পায়। পরবর্তীতে রাই নিজের ছবির সংগ্রহ তৈরি করেন, যার ভূমিকা লেখেন শহিদুল আলম। ২০১২ সালে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে রঘু রাইয়ের ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয়।

রাইয়ের তোলা অন্যতম শক্তিশালী একটি ছবি ছিল এক মায়ের, যিনি তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না কারণ তার স্তন ছিল কঙ্কালসার। সেই মা এবং শিশুর পাজরের হাড় গোনা যাচ্ছিল। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে দুই কিশোরকে হাসাহাসি করতে দেখা যায়। তাদের কাছে ছবিটির করুণ রস বা ক্রোধের বদলে সেটি যেন বিভৎস মনে হচ্ছিল। এই ঘটনাটিই বুঝিয়ে দেয় কেন বাংলাদেশের ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন এবং কেন রঘু রাইয়ের মতো আলোকচিত্রীদের কাজ এত গুরুত্বপূর্ণ।
রঘু রাই ১৯৭১ সালের আগস্টে প্রথমবার পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের অবস্থা দেখতে আসেন। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন: ‘আগস্টে বর্ষা ছিল তুঙ্গে। আকাশ ছিল ঘন মেঘাচ্ছন্ন এবং সারাক্ষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। সীমান্ত দিয়ে কেবল মানুষ আসছিল না, যেন মানুষের ঢল উপচে পড়ছিল। শরণার্থীরা তাদের সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে আসছিল... তারা বৃষ্টিতে ভেজা, বিধ্বস্ত এবং ক্লান্ত। সেখানে এক ধরণের নিস্তব্ধতা ছিল—কেউ কথা বলছিল না। কারণ একে অপরের কষ্ট সবারই জানা ছিল।”

সেই শরণার্থীরা মুখ ফুটে যা বলতে পারছিলেন না, রঘু রাইয়ের ক্যামেরা তা বলে দিচ্ছিল। জ্বালিয়ে দেওয়া ফসল, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ঘরবাড়ি, এবং ধর্ষিতা নারীদের নীরব আর্তনাদ। একটি মর্মস্পর্শী ছবিতে রাই একজন তরুণীর ওপর ক্যামেরা ফোকাস করেছেন, যিনি একটি খাটিয়ায় শুয়ে আছেন, ব্লাউজহীন শাড়ি পরা, দৃষ্টি স্থির এবং শুষ্ক। তার শীর্ণ শরীরের তুলনায় স্ফীত পেট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তিনি এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান ধারণ করছেন, যা যুদ্ধের ভয়াবহ সহিংসতার ফসল।

রঘু রাইয়ের সমসাময়িক কিশোর পারেখও বাংলাদেশের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তারা একই জায়গায় ছবি তুলতেন। তবে তাদের দেখার ভঙ্গি ছিল ভিন্ন। কিশোর পারেখের ছবি নিয়ে প্রকাশিত বই 'বাংলাদেশ: অ্যা ব্রুটাল বার্থ'। পারেখ দেখিয়েছেন রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটি শিশুর নিথর দেহ যার নিচের অংশ রক্তে ভাসছে। পারেখের কাছে আলোকচিত্র ছিল বাস্তবতাকে তার কদর্য রূপসহ তুলে ধরা।

রঘু রাইয়ের ছবির গল্প শেষ হয় বিজয়ের আবহে। তিনি আমাদের নিয়ে যান সেই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে, যেখানে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মবিশ্বাসের সাথে ডেস্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং জেনারেল নিয়াজি মাথা নিচু করে ক্যামেরার দিকে তাকাতে পারছেন না।


সলিল ত্রিপাঠি: যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক; ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনে ২০১৩ সালে প্রকাশিত লেখার সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×