ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিদ্যুৎ-জ্বালানি

রূপপুরের খবরের পাশেই চাই নবায়নযোগ্যে জোর

রূপপুরের খবরের পাশেই চাই নবায়নযোগ্যে জোর
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ‘সক্ষমতা’ যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, তার পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এতটা সক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন করতে পারলে অবশ্য ‘লোডশেডিং’ করতে হতো না। বাস্তবে এটা করতে হয় প্রতিবছর। এর চাপ গিয়ে পড়ে গ্রামাঞ্চলে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন হলে অবশ্য বলা হয়, শহরাঞ্চলেও কিছু লোডশেডিং করা হবে। এটা করা আবার কঠিন। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে শিল্প ও ব্যবসা কেন্দ্রীভূত। সরকারও পরিচালিত হয় শহরাঞ্চল থেকে। এখানে ক্ষমতাবানদের বাস। তবে গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে। এ অবস্থায় সেখানে চাহিদা কম দেখিয়ে তাদের বিদ্যুৎবঞ্চিত করার প্রবণতাও লক্ষণীয়। 

এপ্রিল-মে দেশের উষ্ণতম সময় বলে বিবেচিত। এ সময়ে বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। মাঠে তখনও থাকে প্রধান ফসল বোরো। এর সেচে থাকে বিদ্যুতের চাহিদা। এ সময়টায় গ্রামে লোডশেডিং বাড়লে ধান-চাল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডিজেলচালিত জেনারেটর ঘিরেও সংকট বেড়েছে সহজে ডিজেল না মেলায়। যেসব জমিতে সেচের চাহিদা কমে এসেছে, সেসব ক্ষেত্রে হয়তো রয়েছে স্বস্তি। তবে ধান উত্তোলন, চাল তৈরি আর এর পরিবহনেও ডিজেলের চাহিদা বিরাট। হালে এর ১৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর ঘটনাটি এ কারণেও আলোচিত। এ অবস্থায় বাস ভাড়া বাড়াতে হয়েছে এরই মধ্যে। ট্রাক ভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর চাপ থাকবে পণ্যবাজার, এমনকি রপ্তানি খাতে। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অবশ্য আমরা চালাচ্ছি না খরচ অনেক বেশি বলে। বিদ্যুৎ না পেলে সব ক্ষেত্রেই যেসব জেনারেটর চালাতে হয়, তাতে অবশ্য ডিজেলের ব্যবহার বেশি। 

যত জ্বালানিপণ্য আমরা ব্যবহার করি, তার প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল। এর যে কোনো সংকটে তাই প্রভাব পড়ে দ্রুত আর সবচেয়ে বেশি। সরকারও সচেষ্ট থাকে ডিজেলের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে। ইরান যুদ্ধে আমরা পরিশোধিত ডিজেল আরও বেশি করে এনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছি। ভারত থেকেও পাইপলাইনে বেশি ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে। সেখান থেকে বিদ্যুৎও আমদানি করছি। ‘আদানির বিদ্যুৎ’ অনেক আলোচিত। তার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিও। আদানির একটি ইউনিট বসে পড়ার ঘটনা লোডশেডিং বাড়িয়ে দিয়েছিল। দ্রুতই অবশ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। দেশেও আদানির মতো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে সক্রিয় করা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধে কয়লার দামও বেড়ে গিয়েছিল মাঝে। অতি সম্প্রতি দাম কমে আসার খবর স্বস্তির। কেননা, আমরা এ ক্ষেত্রেও বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। আর পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না বলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা-নির্ভরতা বেড়েছে। গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও এ মুহূর্তে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেই মিলছে অধিক বিদ্যুৎ। সামনে এটা আরও বাড়তে পারে। 
সংকটকালে ‘পছন্দ’ কমে আসে। কোনটি পরিবেশবান্ধব, সে বিবেচনাও পাশে সরিয়ে রাখা হয়। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ আসার বিষয়টি তেমনই। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে আগের চাইতে কম গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তার জন্য আবার একটি বাদে সব কটি সার কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও সক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে না পারায় এমনকি ইউরিয়া সার আমদানি কালক্রমে অনেক বাড়াতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সারের দামও বেড়েছে অনেক। এলএনজির মতো এটাও বেশি আনতে হচ্ছে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে, অনেক বেশি দামে। বোরো মৌসুম সারের কারণে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, জানা নেই। তবে আমনের জন্য সারের মজুত বাড়াতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ভর্তুকি কমাতে সারের দাম বাড়ানো হবে কিনা, কে জানে! এখন কয়লার দাম আরও কমলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে বন্ধ সার কারখানাগুলো চালু করা যায় কিনা, সেই চেষ্টাও করতে হবে। কৃষিতে বিশেষত ধান-চাল উৎপাদন ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। অধিকতর উৎপাদন ব্যয়ের চাপে কৃষকও যেন নিরুৎসাহিত না হন। তার সামনে তো বিকল্প ফসল উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে। 

এসএসসি পরীক্ষা চলতে থাকায় বিশেষত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। হালে ঝড়বৃষ্টিতে আবহাওয়া কিছুটা আরামদায়ক হলেও বিদ্যুতের চাহিদা সামনে আরও বাড়বে। শিল্প খাত কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় সেখানেও পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের সংকট ঘিরে সৃষ্ট চাপও গিয়ে পড়ছে শিল্পে। এতে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। রপ্তানি আয় অব্যাহতভাবে কমে যাওয়াও বিপজ্জনক। শান্তি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়ে এমনকি থেমে থেমে সংঘাত চললে বিশেষত কোরবানি ঈদের পর রেমিট্যান্সে টান পড়বে। তখন রিজার্ভ নিয়ে বাড়তে পারে উদ্বেগ। এতে সংকটে পড়বে আমদানি-সক্ষমতা। শিল্পের জন্যও বিপুল আমদানি আমাদের প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালসহ খাদ্যশস্য আমদানি বাড়লে অনেকটাই বিপদে পড়ে যাব। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জ্বালানি ও সার সংকটে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন কমে আসার খবর দিচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে ‘সুপার এলনিনো’র শঙ্কা। আমরা চাই, এমন সব পূর্বাভাস বেঠিক হোক! 

এর মধ্যে ভালো খবর– রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিকমতো চললে আগস্টে এখান থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মেলার আশা। একটি ইউনিট থেকে শতভাগ অর্থাৎ ১২০০ মেগাওয়াট পেতে বছরখানেক অপেক্ষা করতে হবে। তারপর দ্বিতীয় ইউনিট যুক্ত হলে আরও ১২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার আশা। ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত না হলে এরই মধ্যে রূপপুরের দুই ইউনিটই তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এ সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন আছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্নও তোলা হয়ে থাকে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুতের ইতিবাচক দিক কম নয়। ঝুঁকি ‘অ্যাড্রেস’ করে কেন্দ্রটি পরিচালনা করতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে আমরা বিদ্যুতের দামেও হয়তো সুফল পাব। বর্তমান চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ মিলবে রূপপুর থেকে। এ অবস্থায় আরও দুটি ইউনিট গড়ার চিন্তাভাবনার কথা জানা যাচ্ছে। সেটির ‘সম্ভাব্যতা’ যাচাই করেই অবশ্য এগোতে হবে। 

সবচেয়ে ভালো হতো এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে যেতে পারলে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জ্বালানি, বিশেষত এলএনজি সংকটে পড়েও আমরা এদিকে যাইনি। নবায়নযোগ্য, বিশেষত সোলার থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছি মোট উৎপাদনের ৫ শতাংশের মতো। একই সময়ে লোডশেডিংয়ে ভোগা পাকিস্তান সোলারে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে বলে খবর মিলছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এ ক্ষেত্রে এগোতে পারিনি, তার গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ বেশি করে বুঝিয়ে দিল জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষত এর ওপর বিপুল আমদানি-নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এগোতে পারলেও না হয় কথা ছিল। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগোতে পারলে আমরা বেশি করে পারব শিল্পে গ্যাস জোগাতে। সার উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে। রূপপুরও আমাদের পারবে টেকসইভাবে পরিবেশসম্মত বিদ্যুৎ জুগিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও ব্যয় কমাতে। তার আগ পর্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ‘লোড ম্যানেজমেন্ট’ করেই চলতে হবে। 

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×