ইরানি নারীদের ওপর হামলার ব্যাপারে পশ্চিমা নারীবাদীরা নীরব কেন
সাহার মারানলু
প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬ | ১৬:২৯ | আপডেট: ০২ মে ২০২৬ | ১৬:৩১
নারীবাদীদের মনোযোগ নিরপেক্ষ নয়। এটি আকার দেওয়া হয়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালনা করা হয় এবং তা সবসময় সবার সাথে ন্যায্যতা করতে পারে না। ২০২২-২০২৩ সালে পশ্চিমা নারীবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের বিক্ষোভের পক্ষে বেশ জোরেসোরে সমর্থনে দিয়েছিল। এছাড়া তারা বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে তখন নারীদের প্রতিরোধকে একটি যুগান্তকারী নারীবাদী সংগ্রাম হিসেবে উদযাপন করে। আজ যখন যুদ্ধে ইসরায়েল ও মার্কিন সেনারা নারী ও কিশোরীদের হত্যা করছে এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ ধ্বংস করছে, তখন সেই একই প্রতিষ্ঠানগুলো লক্ষণীয়ভাবে নীরব!
এই হঠকারিতা আকস্মিক নয়। এটি পছন্দমতো কোনো কোনো বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি রাখার যুক্তিকে উদোম করে; এই পদক্ষেপ নির্ধারণ করে যে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কোন রূপগুলো স্বীকৃতি পাবে এবং কোনগুলো পাবে না, বরং বিলীন হতে দেওয়া হবে। আমি এই লেখাটি লিখছি একজন ইরানি নারী এবং আইন, সমাজ ও নারী-পুরুষ অধ্যয়ন বিষয়ে কর্মরত শিক্ষাবিদ হিসেবে, যিনি দৃশ্যমান সেই অসম ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন।
চল্লিশ দিনের হামলায় ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৫১ জন নারী ও ২১৬ জন শিশু নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতরাও ছিল, যেখানে বেশিরভাগই কিশোরীসহ ১৬৫ জনেরও বেশি শিশু প্রাণ হারায়। তারা যাত্রাপথে বা আকস্মিকভাবে নিহত হয়নি; নিহতরা ছিল সেইসব শিশু যারা শ্রেণিকক্ষে বসে শিখছিল, যখন একটি মার্কিন হামলা তাদের চারপাশের পরিবেশকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং তাদের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা দেয়। তাদের ডেস্ক, তাদের বই, তাদের কণ্ঠস্বর— একসময় তাদের যে ভবিষ্যৎ ছিল তার সমস্ত চিহ্ন —তাদের সাথেই কবরস্থ হয়।
তবুও এই সহিংসতার ব্যাপকতা ও স্পষ্টতা সত্ত্বেও এটি সেই ধরনের ধারাবাহিক নারীবাদী ক্ষোভের জন্ম দেয়নি, যা আমরা ২০২২ সালে দেখেছিলাম। যখন ইরানি নারীরা তাদের হিজাব খুলেছিলেন, তখন তাদের ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সপ্তাহ ও মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আন্দোলনকর্মী ও সংবাদমাধ্যমগুলোতে তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। এই বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শত শত নারী, মেয়ে ও শিশু সেই প্রচারণা কখনোই পায়নি। আমরা যা দেখছি তা কেবল মনোযোগের অভাব নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত পশ্চাদপসরণ, সহিংসতার নির্দিষ্ট কিছু রূপকে নারীবাদের জায়গা থেকে স্বীকৃতিই দেয়া হয়নি। মিনাবের ঘটনাটি এমন একটি মুহূর্ত হওয়া উচিত ছিল, যা বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরাটা বাধ্যবাধকতা করবে, যা অন্তত ক্ষণিকের জন্য এক বৃহত্তর ও দীর্ঘস্থায়ী নীরবতাকে ভেঙে দেবে। শ্রেণীকক্ষে কিশোরীদের হত্যা যদি নারীবাদী বিষয় না হয়, তাহলে কোনটিকে আমরা নারীবাদী বলবো?
যুদ্ধ কখনোই লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়। নারী ও শিশুরা আকস্মিক ঘটনার শিকার নয়; তারা এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। মিনাবে যা ঘটেছে তা এই ধারার বাইরে নয়, বরং এর সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রকাশ। ওই স্কুলটির ধ্বংস শুধু একটি মানবিক সংকটও নয়; বরং এটি একটি নারীবাদী সংকটও বটে। মূলত এটি একটি প্রজন্মকে তার গঠনের ঠিক মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
কিন্তু ঠিক এখানেই মূলধারার নারীবাদী সম্পৃক্ততার সীমাবদ্ধতাগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যে নেটওয়ার্কগুলো একসময় পোশাকবিধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধরত ইরানি মেয়েদের ছবি প্রচার করত, এখন তাদের হত্যার মুখে তারাই মূলত নীরব থেকেছে। এই পরিবর্তন আকস্মিক নয়। এটি সেই শর্তগুলোকেই উদোম করে দেয়, যার অধীনে নারীবাদীরা স্বীকৃতি দেয় কিংবা প্রত্যাহার করে নেয়।
যদি নারীবাদ পোশাকবিধির বিরুদ্ধে যতটা স্পষ্টভাষী, কন্যাশিশু হত্যার বিরুদ্ধে ততটা স্পষ্টভাষী হতে না পারে, তবে তার সার্বজনীনতার দাবিগুলো নড়বড়ে হয়ে যেতে শুরু করে। যা অবশিষ্ট থাকে, তা হল বেছে বেছে কিংবা পছন্দ করে গঠিত এক নারীবাদ। কারণ আজ রাতে হয়তো কোথাও নারীরা এখনও সদ্য খোঁড়া কবরের পাশে তাদের কণ্যাশিশুদের কিছু অবশিষ্ট আছে তা আঁকড়ে ধরে বসে আছে; আর যে জীবনগুলো বেড়ে ওঠার, শেখার, বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার পরিবর্তে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
সাহার মারানলু: রয়্যাল হলোওয়ের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রভাষক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
