আওয়ামী লীগ
অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না
ফাইল ছবি
মো. আবু নাসের
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ২১:২০
২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই দলটির জন্ম হয়েছিল এক উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে, যখন বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ছিল প্রায় অস্বীকৃত। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম প্রধান বাহক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা, প্রতিটি পর্বে দলটির ভিত গড়ে ওঠে সংগঠন, জনমত ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে; যে কারণে আওয়ামী লীগ কেবল একটি দল নয়, এই সংগঠনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের গল্পে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে শুরু করে ছয় দফা আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্বে দলটির সক্রিয় ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। এসব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটি ধীরে ধীরে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
আওয়ামী লীগের জনভিত্তি গঠনে তখনকার তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। রাজনীতিকে শহরের এলিট গণ্ডি থেকে বের করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির দাবি-দাওয়া সরাসরি রাজনৈতিক এজেন্ডায় নিয়ে আসেন, যা দলটিকে দ্রুত জনমুখী সংগঠনে পরিণত করে। তাঁর অসাধারণ বক্তৃতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ আওয়ামী লীগকে একটি গণমানুষের দলে রূপ দেয়। তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন, কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার যে ধারাটি তিনি তৈরি করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী সময়ে দলের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন ও সংগ্রামের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পেছনে আওয়ামী লীগের অবদান ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ। এই অর্জন দলটির রাজনৈতিক বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের কঠিন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন ও নতুন রাষ্ট্রের অর্থনীতি দাঁড় করানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মর্মবাণী দলটির আদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট করে। যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্ভিক্ষ, বৈদেশিক চাপে নীতিগত ওঠানামা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন টানাপোড়েন তৈরি করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্ষমতা দুর্বল থাকায় সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ফাঁকে জনগণের প্রত্যাশা বহুবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এবং পরবর্তী সামরিক শাসনের সময় দলটি কঠিন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। নেতৃত্বের সংকট, সংগঠনগত দুর্বলতা এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও দলটি টিকে থাকে এবং পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ সময় আওয়ামী লীগের শক্তি ছিল তৃণমূলের টেকসই নেটওয়ার্ক ও ঐতিহাসিক বৈধতা।
পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুদ্ধারে দলটির অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে আওয়ামী লীগ আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে ফিরে আসে। এরপর ক্ষমতায় ও ক্ষমতার বাইরে পালাবদলের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে দলটি আরও পরিপক্ব হয়ে ওঠে। এ সময় থেকেই উন্নয়নকেন্দ্রিক ইশতেহার, অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কল্পনার ভাষা রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে বড় আকারের অবকাঠামো নির্মাণে নজির গড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, ডিজিটাল রূপান্তরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের দাবি করে। পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এই সময়ের উল্লেখযোগ্য দিক।
তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে কিছু গভীর উদ্বেগও ঘনীভূত হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন, এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রায়ন রাজনৈতিক পরিবেশকে ত্রস্ত করে। দুর্নীতি ও স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব উন্নয়ন সুফলের ন্যায়সংগত বণ্টন ব্যাহত করে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনে ধীরগতি এবং নীতির ধারাবাহিকতায় স্বচ্ছতার ঘাটতি দ্রুত অর্জনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিরোধী দলগুলোকে রাজনীতির মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলে। দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না বললেই চলে। এসবই আওয়ামী লীগের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিবর্তন আওয়ামী লীগকে আবারও কঠিন সময়ের মুখোমুখি করেছে। আওয়ামী লীগ যে ভুল করেছিল তাকে অজুহাত বানিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। হাজার হাজার নেতাকর্মী জেলে অথবা নির্বাসনে রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের পুনর্গঠন করা।
সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সামনে মূল প্রশ্ন হলো আস্থার পুনর্গঠন। গণআস্থা কেবল বক্তৃতায় ফিরে আসে না, ফিরে আসে কাঠামোগত সংস্কারের ভেতর দিয়ে। এখানে অগ্রাধিকার হতে পারে দলের ভেতর জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং নীতিনির্ধারণে নতুন প্রজন্ম, নারী ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক স্থান দেওয়া। দলের ঐতিহাসিক ব্র্যান্ডকে আধুনিক সংগঠনশৈলীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই দলটি নবজাগরণ পেতে পারে।
দলটির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মসমালোচনা। একটি দল যত বড়ই হোক, টিকে থাকার শর্ত হলো ভুল স্বীকারের সক্ষমতা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে যে সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি তৈরি হয়েছে, তা স্বীকার করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।
রাজনীতিতে পুনরাগমনের জন্য আওয়ামী লীগকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একদিকে যেমন সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে তেমনি জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মূল্যস্ফীতির মতো ইস্যুগুলোতে কার্যকর অবস্থান নেওয়া জরুরি। শুধু অতীতের অর্জনের ওপর নির্ভর করে রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। দলের ভেতর ভাবনা-চিন্তার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনও জরুরি। জলবায়ু অভিযোজন, নীল অর্থনীতি, কৃষিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির প্রস্তুতি–এসব বিষয়ে থিঙ্কট্যাঙ্কধর্মী নীতি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে দলটি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংলাপ দলটির নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে পারে।
আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক শক্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ। সময়ের পরিক্রমায় সেই মূল্যবোধকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং তা থেকে নীতিগত দিশা বের করা এখনকার বড় কাজ। প্রতীক বা আবেগের শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় তখনই, যখন তা ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ পায়। এই রূপান্তর ঘটাতে পারলে অতীতের বৈধতা ভবিষ্যতের ম্যান্ডেটে পরিণত হতে পারে।
এছাড়া রাজনৈতিক সংলাপের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখা, শত্রু হিসেবে নয়, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গঠনে সহায়ক হতে পারে। আওয়ামী লীগ যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যায়, তবে তা দলটির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ইতিহাস শুধু গৌরবের বিষয় নয়, এটি দায়বদ্ধতারও বিষয়। অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না, বরং নতুন বাস্তবতায় নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। ইতিহাস যাদের হাতে আংশিক লেখা, ভবিষ্যতের পাতাও তাদের হাতে উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ বেশি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে শুধু প্রতিষ্ঠার স্মৃতিচারণ নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ ভাবনার সুযোগও তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ যদি তার ঐতিহ্য, আদর্শ ও জনমুখী রাজনীতিকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে দলটি আবারও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ফিরে আসবে। রাজনীতির পথ কখনও সরল নয়। উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা মিলিয়েই একটি দলের ইতিহাস গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই অধ্যায়ে দলটি কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করে এবং ভবিষ্যতের রাজনীতিতে কী ভূমিকা রাখে।
ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের যোগাযোগ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারপারসন
- বিষয় :
- আওয়ামী লীগ
- সাফল্য অর্জন
- শেখ হাসিনা
- রাজনীতি
