ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আধিপত্যে বাংলাদেশের জন্য বার্তা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আধিপত্যে বাংলাদেশের জন্য বার্তা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১৫:৪০ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:০৩

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেশটির অভ্যন্তরে যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোতেও– বিশেষত সীমান্ত এলাকায়– এ নির্বাচনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফলে শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এই নির্বাচনের ফলাফর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, বিজেপি ১৯৩ আসনে এগিয়ে, আর তৃণমূল ৯৬ আসনে। এই প্রাথমিক ফলাফলই প্রমাণ করছে যে, রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে। তবে এবারের নির্বাচনী ফলাফল শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, ভোট প্রক্রিয়া ও নির্বাচনী পরিবেশের ধরনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

নির্বাচনকে ঘিরে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসআইআর (সিস্টেমেটিক ইলেকটোরাল রোল) করে এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সির নামে ২৫ লাখ ভোটারকে ভোট দিতে না দেওয়া, নির্বাচনী এলাকাগুলোতে আড়াই থেকে পৌনে তিন লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, ৬৫০ পুলিশ কর্তা ও আমলার বদলি, এবং গণনাকেন্দ্রে ভার প্রধানত কেন্দ্রীয় সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার কর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া— এসব অভিযোগ ভোটের স্বচ্ছতা এবং সংবিধানিক মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। যদিও এখন পর্যন্ত এই ভোটের স্বচ্ছতা ও অভিযোগ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বটে, তবে প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি ও আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। 

রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি বা প্রশাসনিক পরিবর্তন প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে এমন নির্বাচনে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের তৎপরতা চালিয়ে আসছে। সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা বিশেষভাবে নজরদারি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উত্তেজনার দিকে ঝুঁকতে পারে। বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে জোরালোভাবে চিড় ধরেছে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাব সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত ভাগাভাগি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন সেখানে নানা প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে যে, রাজ্য প্রশাসনের নীতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনে, এই প্রভাব কিভাবে প্রতিফলিত হবে তা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনগণও এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে গভীরভাবে নজর দিচ্ছে। ভোটের ফলে যে সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তার নীতি ও আচরণ জনমত এবং ভোটারের আস্থা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রশাসনিক চাপ বা ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো সমাধানের জন্য স্বাধীন তদন্ত এবং স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। ভোটের ফলাফলকে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য করা জরুরি। অন্যথায়, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ক্ষোভ বড় আকারে দেখা দিতে পারে। 

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন শুধু রাজ্যের নয়, দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকেও নতুন রঙ দিয়েছে। বিশেষত দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীসহ অনেকে সংখ্যালঘু ও মুসলমানদের ব্যাপারে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছিল। নির্বাচনকালেই তিনি বলেছেন, হিন্দু ইভিএম বিজেপির, মুসলিম তৃণমূলের। এ ধরনের জাতিবিদ্বেষী অসংখ্য মন্তব্য করেছেন বিজেপি একাধিক নেতারা। ফলে জাতিগত বিদ্বেষজনিত উত্তেজনা কেবল দেশটির অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, স্বাভাবিকভাবেই তা প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলে। 

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ভোটে নয়, তার স্বচ্ছতা এবং আস্থার মধ্য দিয়ে সমাজে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করে। একইসাথে প্রতিবেশী জনগোষ্ঠী এবং সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের উপরও নির্ভর করে দেশগুলোর নিরাপত্তা ও প্রশান্তি। কিন্ত অতীতের ঘটনা থেকে বলা যায়, বিজেপি এই পথে এগুবে বলে মনে হয় না; বরং বিধানসভা নির্বাচনের সফলতাও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের অর্জন হিসেবে দেখাতে চাইবে। আর এতে উত্তেজনা বাড়বে বৈকি কমবে না। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×