মুক্তাগাছা
এক উপজেলায় এত অপহরণ!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় সংঘটিত শিশু-কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ন্যায় উদ্বেগজনক ঘটনাবলি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই স্মারক বলিয়া আমরা মনে করি। রবিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গত দুই মাসের কম সময়ে ২২টি নিখোঁজের ঘটনায় মুক্তাগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি হইয়াছে। উপরন্তু থানায় জিডি হয় নাই, এমন কতিপয় নিখোঁজের ঘটনাও তথায় উক্ত সময়ে ঘটিয়াছে। আতঙ্কের বিষয়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু-কিশোর- কিশোরী; এমনকি ৩ বৎসরের শিশুও রহিয়াছে। অন্যদিকে মুক্তাগাছা থানা পুলিশ কয়েকজনকে উদ্ধার করিলেও নিখোঁজ ও উদ্ধার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পুলিশ বা পরিবারের নিকট পাওয়া যাইতেছে না। নিখোঁজ হইবার পর সংশ্লিষ্ট অনেক পরিবার যদ্রূপ থানায় অভিযোগ জানাইতেছে না, তদ্রূপ উদ্ধারের পরও অনেকে কোনো মামলার আশ্রয় গ্রহণ করিতেছে না। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট অভিভাবকগণ হয় পুলিশের অসহযোগিতার কথা বলিতেছেন, নয় তো পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবিয়া বিষয়টি গোপন রাখিতেছেন।
অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি সম্ভাব্য সংগঠিত ঝুঁকি, সামাজিক অবহেলা অথবা অপরাধ চক্রের সক্রিয়তার ইঙ্গিত বহন করিতে পারে। অনেক অভিভাবক তাহাদের সন্তান পাচারকারী চক্রের হাতে পড়িয়াছে বলিয়া মনে করেন। এই আশঙ্কা ফুৎকারে উৎক্ষেপ করা যাইবে না– প্রতিকারহীন থাকিলে এহেন ভয়ংকর অপরাধের ঘটনা দেশের অন্যত্রও ঘটিতে পারে। বস্তুত পুলিশের পরিসংখ্যানও এমন কিছুর ইঙ্গিত করিতেছে। গত ১০ জানুয়ারি সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পুলিশ সদরদপ্তরের অপরাধ তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক দেখানো হয়, ২০২৫ সালে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটিয়াছিল ১১ শতাধিক, যাহা পূর্ববর্তী বৎসরে ছিল ৬৪২টি। অর্থাৎ এক বৎসরেই অপহরণের সংখ্যা বাড়িয়াছিল ৪৬০; যাহা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৭২। একই উৎসের তথ্য বলিয়াছে, ২০২৩ সালে অপহরণের ঘটনা ছিল ৪৬৩; ২০২২ সালে ৪৬০ ও ২০২১ সালে ৪৪৫টি। প্রসঙ্গত, মুক্তাগাছার পুলিশ আলোচ্য ঘটনাবলিকে নিখোঁজ খাতায় নিখোঁজ ও অপহরণের মধ্যে পার্থক্য থাকিতে পারে, তবে মুক্তাগাছার ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা অপহরণেরই অভিযোগ করিয়াছেন। ততায় উদ্ধারকৃত কয়েকজন সমকালের প্রতিবেদককে স্পষ্ট করিয়াছেন, অপরাধ চক্র তাহাদের ফুসলাইয়া দেশের অন্যত্র লইয়া গিয়াছিল, যাহা অপহরণের শামিল।
গত বৎসর দেশে অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধির পশ্চাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামগ্রিক অপরাধ দমনে ব্যর্থতা বড় কারণ ছিল। তখন এই বিষয়ে জনপরিসরে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হইয়াছিল। আমরাও এই স্তম্ভে একাধিকবার উক্ত বিষয়ে তৎকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া সম্পাদকীয় লিখিয়াছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঐ সকল কিছুই ব্যর্থ ক্রন্দনে পর্যবসিত হইয়াছিল। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার পূর্বসূরির ঐ নিষ্ক্রিয়তা হইতে বাহির হইয়া আসিবে– এই প্রত্যাশা ছিল আমাদের। কিন্তু উহা কতটা পূরণ হইবে– ইতোমধ্যে সেই প্রশ্নও উঠিয়াছে। উপরন্তু আলোচ্য অপহরণের ঘটনাবলি প্রশ্নটিকে জোরদার করিয়াছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন যখন মুক্তাগাছার বিশেষত কিশোরী অপহরণের ঘটনাবলির ব্যাখ্যা হিসাবে ‘প্রেমঘটিত কারণে স্বেচ্ছায়’ পালাইয়া যাওয়ার কথা বলেন, তখন শুধু উক্ত অপরাধ বন্ধ নহে; অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশ কতটা আন্তরিক– সেই প্রশ্নও উত্থাপন করা যায়।
আমরা মনে করি, আলোচ্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে আজিকে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির যে কথা বলিতেছে, তাহার সূচনা অনেক পূর্বেই করা যাইত। পূর্বে সংঘটিত অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করিয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করিলে আজিকার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিহার করা যাইত। যাহা হউক, অপহরণের ন্যায় জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। অপহরণপ্রবণ এলাকাগুলিতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, তৎসহিত অপহৃতদের দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
