বিশ্লেষণ
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কলকাতা হয়তো আর বাধা হবে না
প্রতিম রঞ্জন বসু
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ১৯:০৬
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে এর প্রভাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তের দুইপাশে কথা-বার্তা হচ্ছে। পূর্ববর্তী সময়ে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে অনেক কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে সীমান্ত বাণিজ্য, অভিবাসন, নিরাপত্তা বা আন্তঃদেশীয় যোগাযোগসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট ছিল। এতে করে নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে এবং কখনও কখনও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, কূটনৈতিক সম্পর্কে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্ক প্রধানত মূল বিষয় থাকে না। রাষ্ট্রের নীতিই রাজ্যের নীতি হয়। কাছাকাছি বা সীমান্ত দেশ হওয়ায় কোথাও কোথাও উত্তেজনাকর কিংবা কিছু যোগাযোগ থাকে। এই দুটো মিলিয়ে এক ধরনের পরোক্ষ প্রভাব কূটনীতিতে পড়ে, প্রত্যক্ষ নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে এগোচ্ছিল না। ফলে দিল্লির সিদ্ধান্ত রাজ্যে এসে বাস্তবায়নে গেলেই সমস্যা দেখা দিচ্ছিল।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং তার কূটনৈতিক প্রভাব নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার কেন্দ্রের হলেও, সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় সেই নীতির প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জ্বালানি কিংবা পানিচুক্তির ক্ষেত্রেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য। ঢাকার সঙ্গে দিল্লি কোনো চুক্তিতে এগিয়ে গেলে রাজ্য তখন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনতে পারে, কিন্তু কখনও রাজ্য বিরোধিতা করবে না। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কলকাতা হয়তো আর বাধা হয় দাঁড়াবে না।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও পানিবণ্টন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। এই দুই খাতে যেকোনো চুক্তি শুধু দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বাস্তবতা ও স্বার্থও এতে জড়িত থাকে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য, যা ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত, সেখানে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজ্যের ভূমিকা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যখন জ্বালানি সহযোগিতা বা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা এগোয়, তখন সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলো সাধারণত তাদের নিজস্ব স্বার্থ, কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়গুলো সামনে আনে। এটি কোনোভাবেই চুক্তির বিরোধিতা নয়; বরং একটি ভারসাম্য খোঁজার প্রয়াস। কারণ রাজ্য সরকারগুলো সরাসরি জনগণের চাহিদা ও উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত, যা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আলোচনায় সবসময় পূর্ণভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
বাস্তবে দেখা যায়, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে রাজ্যগুলো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে বাধা সৃষ্টি না করে বরং শর্ত ও পরামর্শের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে। ফলে চুক্তিগুলো দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। জ্বালানি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি কিংবা গ্যাস সংযোগ, এবং পানিচুক্তির ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা–এসব বিষয়েই এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত ভূমিকা চুক্তিগুলোকে আরও টেকসই করতে পারে। তাই বলা যায়, রাজ্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; বরং এটি একটি সহায়ক শক্তি, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সুসংহত ও ফলপ্রসূ করে তোলে।
লক্ষণীয়ভাবে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি হলো বাংলাদেশের মতো; এখানে ক্ষমতাসীনরা সবকিছু খেয়ে ফেলতে চায়–রিকশা স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে সবকিছু। সে একাই খাবে। পশ্চিমবঙ্গে ৬০-৭০ দশক থেকে এই রাজনৈতিক ধারাটা শুরু হয়। শুরুর দিকে কংগ্রেস কিছু স্বেচ্ছাচারিতা করে, পরে বামপন্থিরা ক্ষমতায় এলে এক ধরনের নির্বাচনী স্বৈরশাসন গড়ে তোলে। এই ভিত্তির ওপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি গড়ে ওঠে। মমতা ক্ষমতায় থাকাকালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রশাসনিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। সবক্ষেত্রে এই সরকার পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য ক্ষতি করেছে।
প্রতিম রঞ্জন বসু: ভারতীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; কলকাতাভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইরাবতী রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেন্টারের উপদেষ্টা
- বিষয় :
- পশ্চিমবঙ্গ
- ভারত
