ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

বর্ষাকালে চট্টগ্রাম শহরের দুর্ভোগ কি যাবে না

বর্ষাকালে চট্টগ্রাম শহরের দুর্ভোগ কি যাবে না
×

ইকবাল আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম শহরে বৃষ্টি নামলেই যে দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা এক অদ্ভুত পরিচিত কাহিনি– পানি জমে থাকা রাস্তাঘাট, থমকে থাকা যানবাহন, ভোগান্তিতে নিমজ্জিত মানুষ। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই যেন শহর তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। অথচ এই জলাবদ্ধতা কিংবা জলজট কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নাগরিক উদাসীনতা এবং বিভিন্ন নগর উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার যৌথ ফল, যা আমরা বারবার দেখি, আলোচনা করি, কিন্তু কার্যকর সমাধান করতে পারি না। আমরা তখন বিস্মিত হই, ক্ষুব্ধ হই, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিই। এর ফলে যথারীতি জরুরি বৈঠক বসে। তারপর? আবার অপেক্ষা– পরবর্তী বৃষ্টির। এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; নাগরিক আচরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, নীতিগত সমন্বয়সহ সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথমেই আসা যাক নাগরিক সচেতনতা প্রসঙ্গে। আমরা প্রায়ই বলি, মানুষ সচেতন নয়। কিন্তু সচেতনতা কি নিজে নিজে জন্মায়? এটিকে তৈরি করতে হয়; চর্চা করতে হয়; প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বাধ্যতামূলক পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বই পড়বে না, বরং বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেবে। যেমন নিজ নিজ এলাকায় বর্জ্য আলাদা করার প্রকল্প, ড্রেন পরিষ্কার অভিযানে অংশগ্রহণ, পলিথিনবিরোধী ক্যাম্পেইন।

স্থানীয় সরকার বা সিটি করপোরেশন চাইলে ‘ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক কমিটি’ গঠন করতে পারে, যেখানে বাসিন্দা নিজেই নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তদারকি করবে। এতে একদিকে যেমন দায়বদ্ধতা বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধানও সম্ভব হবে। তবে শর্ত একটাই– এই কমিটিগুলো যেন কেবল নামেই না থাকে; কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এখন আসা যাক আমাদের প্রিয় পলিথিন প্রসঙ্গে, যা এক সময় নিষিদ্ধ ছিল, পরে যেন এক রহস্যময় উপায়ে ফিরে এসেছে। মনে হয়, পলিথিনেরও নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাব আছে। না হলে এত সহজে ফিরে আসে কীভাবে? এই বাস্তবতায় শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়; বিকল্প ব্যবস্থাকে সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করতে হবে। পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হলে প্রণোদনা দিতে হবে এবং পলিথিন ব্যবহারে জরিমানা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। এখানে নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, শহরের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার দখলমুক্ত না করলে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন না করলে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের পরামর্শ অনেক সময় ‘ফাইলবন্দি জ্ঞান’ হয়ে থাকে। বিভিন্ন মিটিংয়ে আলোচনা ও রিপোর্ট তৈরি হয়। কিন্তু পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে যেন অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকে।

একই সঙ্গে এখন সময় এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করার। কল্পনা করুন, একটি মোবাইল অ্যাপ, যেখানে নাগরিকরা তাদের এলাকায় ময়লা জমে থাকার ছবি আপলোড করতে পারবেন এবং সিটি করপোরেশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে বা এমন একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম, যেখানে বর্জ্য সংগ্রহকারী গাড়ির গতিবিধি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমনি জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া ‘স্মার্ট বিন’ বা সেন্সরযুক্ত ডাস্টবিন ব্যবহার করা যেতে পারে, যা পূর্ণ হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠাবে। ফলে সময়মতো বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হবে। শুনতে হয়তো একটু ভবিষ্যৎমুখী মনে হতে পারে; বাস্তবে বিশ্বের অনেক শহরেই এসব প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা কি সবসময়ই ‘পরবর্তী ধাপে যাব’ বলে অপেক্ষা করব, নাকি এখনই শুরু করব?
বেসরকারি খাতকেও সিরিয়াসলি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন দক্ষতা বাড়বে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। 

সবশেষে আবারও, আমাদের মানসিকতা ও ব্যবহারের পরিবর্তন জরুরি। আমরা প্রায়ই মনে করি, ‘এটা সরকারের কাজ’। কিন্তু শহরটি যেমন সরকারের, তেমনি আমাদেরও। আমরা যদি নিজেরাই যত্রতত্র ময়লা ফেলি, ড্রেনে পলিথিন ঢুকাই, তাহলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।
দেশের যে কোনো শহরের জলাবদ্ধতা তাই কেবল একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত আচরণ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি। যদি আমরা এখনও না শিখি, তাহলে হয়তো একদিন ‘জলাবদ্ধতা’ শব্দকেই শহরের নতুন পরিচয় হিসেবে মেনে নিতে হবে, যেখানে বৃষ্টি মানেই উন্নয়নের বিরতি, আর দুর্ভোগই একমাত্র স্থায়ী বাস্তবতা।

ড. ইকবাল আহমেদ: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×