ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

প্রযুক্তির যুগে চিন্তার অভিমুখ

প্রযুক্তির যুগে চিন্তার অভিমুখ
×

ইকবাল আহমেদ 

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:০৬

যানবাহন ব্যবস্থাপনায় আগে ছিল কাগুজে রেজিস্টার। নির্দেশনা, চেক পয়েন্ট; সবই ছিল পুরো সিস্টেমের ভিত্তি। এই পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সবসময় নিশ্চিত হতো না এবং কাজের সমন্বয় অনেক সময় ধীরগতির হতো। কিন্তু এর একটি বড় শক্তি ছিল, তথ্যের গোপনীয়তা।

পরে ধীরে ধীরে ডিজিটাল টুল যুক্ত হতে শুরু করল। কম্পিউটারে রেকর্ড রাখা, ডিজিটাল আইডি ব্যবহার, সিসিটিভি স্থাপন– এসবের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ল, সমন্বয় সহজ হলো। এক সময় দেখা গেল, নির্দিষ্ট ডিউটি রুমে বসে না থেকেও যে কোনো স্থান থেকে গ্যারেজের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সিসিটিভি প্রস্তুতকারকের সার্ভার ব্যবহার করেই এই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছিল।

এখানেই থেমে থাকেনি। একটি মোবাইল সিম ব্যবহার করে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হলো। ফলে গাড়ি গ্যারেজের বাইরে গেলেও সেটিকে মনিটর করা সম্ভব হলো। এরপর সিসিটিভি, ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং এবং ইউনিটের কম্পিউটার; সবকিছু একটি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলো। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এলো– তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা। তৃতীয় পক্ষের সার্ভারের ওপর নির্ভর করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব সিস্টেম চালালে যথাযথ সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি তৈরি হয়।

সমস্যা ছিল দুটি– একদিকে সক্ষমতা ও সমন্বয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি; অন্যদিকে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ থেকে যদি আমরা দ্রুত সমাধানের দিকে ঝুঁকি, তাহলে দেখা যায়, একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যাকে আরও জটিল করে ফেলি। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু সমাধান দেয় না; নতুন প্রশ্নও তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই আমার মটো: থিঙ্ক অ্যানালগ, দ্যান অ্যাক্ট ডিজিটাল– নেভার ভাইস ভার্সা।

এর অর্থ হলো, প্রথমে সমস্যাকে বুঝতে হবে মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে; বাস্তব পরিস্থিতির ভেতরে দাঁড়িয়ে; সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখে। তারপর দেখতে হবে প্রযুক্তি কীভাবে সেই সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে। আমি মনে করি, এই নীতিটি শুধু নিরাপত্তা বা সামরিক ক্ষেত্রেই নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা; প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত সমস্যার সমাধান খোঁজার ইতিহাস। চাকা, আগুন, কৃষি প্রযুক্তি, শিল্পযন্ত্র– প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে ছিল নির্দিষ্ট সমস্যা এবং তার বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রয়াস। প্রতিটি উদ্ভাবন মূল সমস্যার সমাধান দেওয়ার পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত সুবিধাও সৃষ্টি করেছে, যেগুলোকে আমরা বাই-প্রডাক্ট বলতে পারি। তবে ইন্টারনেটের আগমনের পর এই ধারায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রযুক্তি শুধু সমস্যা সমাধান করে না, বরং নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রযুক্তি আগে তৈরি হচ্ছে, তারপর তার ব্যবহার খুঁজে বের করা হচ্ছে।

এখানে ‘অ্যানালগ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে মানবিক চিন্তা, বাস্তব পর্যবেক্ষণ এবং প্রাথমিক যুক্তি। আর ‘ডিজিটাল’ বলতে বোঝায় প্রযুক্তির প্রয়োগ। ধরা যাক কৃষকের কথা। তার মূল সমস্যা হতে পারে সঠিক সময়ে সেচ দেওয়া বা ফসলের রোগ শনাক্ত করা। যদি আমরা সরাসরি এআই বা আইওটি দিয়ে শুরু করি, তাহলে হয়তো একটি জটিল সমাধান তৈরি হবে, যা তার নাগালের বাইরে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। অ্যানালগ থিঙ্কিং মানে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়। বরং এটি প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার একটি দিকনির্দেশনা। প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু এটি কখনোই মূল উদ্দেশ্য নয়। বর্তমান বিশ্বে এআই এবং অটোমেশন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি আগে তৈরি হচ্ছে, তারপর তার প্রয়োগ খোঁজা হচ্ছে। এতে উদ্ভাবনের গতি বাড়লেও সবসময় তা বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। 

ভবিষ্যতের উদ্ভাবন নির্ভর করবে আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি, তার ওপর। যদি আমরা সমস্যাকে কেন্দ্র করে চিন্তা করি, তাহলে এমন সমাধান তৈরি করতে পারব, যা মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করবে।

ইকবাল আহমেদ: গবেষক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×