কৃষি উন্নয়ন
বিএডিসি এখনও কেন করপোরেশন
আব্দুল্লাহ-আল-মুসাব্বির
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:০৮ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১০:০৮
বাংলাদেশের কৃষি খাত নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু নানা প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস, প্রশাসনিক জড়তা এবং পুরোনো কাঠামোর ধারাবাহিকতায় সেগুলো সামনে আসেনি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-বিএডিসি তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে।
এতে সন্দেহ নেই, দেশের কৃষি ব্যবস্থায় বীজ, সার ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কৃষি ব্যবস্থার চাহিদা, জনসেবার ধরন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। সে কারণে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে– বিএডিসিকে আগের মতোই একটি করপোরেশন হিসেবে রেখে দেওয়ার যৌক্তিকতা এখনও আছে কিনা। অথবা সরাসরি বললে, বিএডিসি কি সত্যিই করপোরেশনের আদলে মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করে?
প্রশ্নটি নিছক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের নয়; এটি রাষ্ট্রের কৃষি-দর্শন, জনসেবা-ব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক রূপ কেবল তার নাম বা আইনি পরিচয়ের বিষয় নয়। সেটি নির্ধারণ করে তার কাজ কীভাবে বোঝা হবে, কীভাবে মূল্যায়িত হবে। সর্বোপরি– কার কাছে তার দায়বদ্ধতা নির্ধারিত হবে।
করপোরেশন ধারণাটি মূলত এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অর্থবহ, যাদের কাজের কেন্দ্রে থাকে উৎপাদন, সম্পদ-পরিচালনা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, সেবা-বিনিময়, আর্থিক ভারসাম্য এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বায়ত্তশাসন। রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের করপোরেট যুক্তির অধীনেই পরিচালিত হয়: সেখানে চুক্তি আছে, সম্পদ আছে, আর্থিক কার্যকারিতা আছে এবং একটি বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা-দর্শন আছে। কিন্তু বিএডিসির ক্ষেত্রে কি সেই যুক্তি সমানভাবে প্রযোজ্য?
বিএডিসির মূল কাজ বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে নিছক বাজারজাত পণ্য বা সেবার পর্যায়ে পড়ে না। এগুলো কৃষি উৎপাদনের মৌলিক উপাদান, খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি। কৃষক সময়মতো মানসম্মত বীজ পাবে কিনা; সারের সরবরাহে সংকট হবে কিনা; প্রান্তিক অঞ্চলে সেচ সুবিধা পৌঁছাবে কি না– এসব প্রশ্নের উত্তর বাজারের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যায় না। এগুলো জননীতি, কৌশলগত পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রশ্ন।
এই জায়গাতেই বিএডিসির বর্তমান কাঠামোগত অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ একটি করপোরেশনের সাফল্য সাধারণত মাপা হয় দক্ষতা, আর্থিক ফলাফল, সেবা পরিচালনা বা সম্পদ ব্যবহারের সূচকে। কিন্তু বিএডিসির সাফল্য মাপতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ডে– কৃষকের কাছে উপকরণ পৌঁছানোর সক্ষমতা, প্রাপ্যতার ন্যায্যতা, ভর্তুকির কার্যকারিতা, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং উৎপাদন-ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। অর্থাৎ বিএডিসির মূল চরিত্র ব্যবসায়িক নয়; এটি জনসেবামূলক, কৌশলগত ও নীতিনির্ভর।
আজ বিএডিসিকে করপোরেশন রেখে দেওয়া কার্যত বাস্তবতাকে নামের আড়ালে লুকিয়ে রাখা। এতে রাষ্ট্রের লাভ নেই; কর্মীদের লাভ নেই; নীতি নির্ধারণও স্বচ্ছ হয় না। বরং এতে তিনটি ক্ষতি হয়। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি অস্পষ্ট থাকে। দ্বিতীয়ত, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেবাশর্ত ও মর্যাদাগত প্রশ্ন ঝুলে থাকে। তৃতীয়ত, কৃষি-ইনপুট ও সেচের মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় কাজকে ভুল সাংগঠনিক ভাষায় বোঝা হয়।
এখানে কেউ আপত্তি তুলতে পারেন– করপোরেশন কাঠামো থাকলে কিছু প্রশাসনিক নমনীয়তা থাকে; দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়; আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে। আপাতদৃষ্টিতে এটি গ্রহণযোগ্য যুক্তি। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, সে নমনীয়তার কতটুকু এখনও কার্যকর? যখন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে সরকারি নীতিমালা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, প্রকল্প-নির্ভরতা, অনুমোদন-সংস্কৃতি এবং দপ্তরকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকে, তখন ‘করপোরেশন’ শব্দটি আর বাস্তব স্বাধীনতার প্রতীক থাকে না। বরং তা একটি ঐতিহাসিক অবশিষ্টে পরিণত হয়।
মূলত বিএডিসির বর্তমান অবস্থান একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। এক সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রকে সরাসরি বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রবেশ করতে হয়েছিল। তখন করপোরেশন কাঠামো হয়তো উপযোগী ছিল। কিন্তু আজকের বাস্তবতায়, যখন কৃষি-শাসন একটি সমন্বিত, বহু-অভিনেতা, বহুস্তরীয় নীতিগত ক্ষেত্র, তখন ১৯৬০-এর দশকের প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তিকে অপরিবর্তিতভাবে টিকিয়ে রাখা বোধহয় আর যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি খাদ্য ব্যবস্থা, জলবায়ু ঝুঁকি, সম্পদ বণ্টন, প্রান্তিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় বীজ, সার ও সেচের মতো খাতকে যে প্রাতিষ্ঠানিকরূপে সংগঠিত করা হবে, তা অবশ্যই তাদের প্রকৃত চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিএডিসির ক্ষেত্রে সেই প্রকৃত চরিত্র নিঃসন্দেহে করপোরেটের চেয়ে বেশি সরকারি, বেশি নীতিনির্ভর, বেশি জনসেবামূলক ও অধিকতর কৌশলগত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এত দিনেও সরকার বিষয়টির দিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টি দেয়নি। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আলোচনাতেও বিএডিসির এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। অথচ বাস্তবতা স্পষ্ট– এই সংস্কারকে আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য স্বার্থের প্রশ্নে বিএডিসির কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস এখন দ্রুত ও গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
আব্দুল্লাহ-আল-মুসাব্বির: পিএইচডি গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- কৃষি উন্নয়ন
