অর্থনীতি
কাগুজে বাজেট নয়, মানুষ চায় স্বস্তি
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:১৪
আসন্ন বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও শোনা যাচ্ছে– বাজেট হবে বিশাল, অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক। কিন্তু একটু থামা দরকার। বাজেটের আকার কি আসলে মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়? মানুষ জানতে চান, বাজারে আলু-পেঁয়াজের দাম কমবে কিনা। শ্রমিক জানতে চান, কাজ থাকবে কিনা। উদ্যোক্তা জানতে চান, লাইসেন্স পেতে কতটা হয়রানি সইতে হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর বাজেটের অঙ্কে নেই; আছে বাস্তবতায়।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ মাত্র তিন মাসের কম। তাই এখনই পূর্ণ মূল্যায়নের সময় নয়। তবু কিছু পর্যবেক্ষণ করা দরকার। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু অর্থনীতির মাঠের মানুষদের, মানে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। নতুন সরকার এই জায়গায় পরিবর্তন এনেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা অংশীজনদের সঙ্গে বসছে; কথা বলছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তবে উদ্বেগের জায়গাও আছে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে কিছু কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। কিন্তু সেই সংকেত খুব একটা জোরালো নয়। সম্প্রতি ব্যাংক রেজুলেশন আইনে এমন একটি ধারা যোগ করা হলো, যাতে বিতর্কিত আগের মালিকদের ফিরে আসার পথ খুলে গেছে। এটি কী বার্তা দেয়? রাজস্ব সংস্কারেও দৃঢ়তার অভাব লক্ষণীয়। সংস্কার না করলে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেই কী আর না করলেই কী– ঘাটতি থাকবেই। সংস্কারের প্রশ্নটি তাই আসলে সরকারের দৃঢ়তার প্রশ্নও বটে।
এবারের বাজেট প্রণয়নে তিনটি বাধ্যবাধকতা প্রথম থেকেই সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমত, রাজস্ব ঘাটতি। এটি এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-প্রসূত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকির বোঝা, যা বাড়ছে কিন্তু কমার লক্ষণ নেই। তৃতীয়ত, নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপ। যে কোনো সরকারের জন্যই এটি অনিবার্য। এই তিনটি চাপ একসঙ্গে সামলাতে গেলে শুধু বাজেটের আকার বাড়িয়ে লাভ নেই। দরকার সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং সততার সঙ্গে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।
বাংলাদেশ কভিড থেকে শুরু করে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানে হামলা, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, চলমান জ্বালানি সংকট– একের পর এক ধাক্কা সামলাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বড় বাজেট ঘোষণা কি আদৌ অর্থ রাখে, যদি তা বাস্তবে কার্যকর না হয়? আমাদের চিরাচরিত ব্যর্থতা হলো, বাজেটের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় থাকে না। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বছরের পর বছর পূরণ হয় না, তবু প্রতিবার লক্ষ্য আরও উঁচুতে বাঁধা হয়। প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে যে দৃঢ়তা দরকার, তা না দেখালে এই পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে না।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলতে গেলে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে। আমরা এখনও গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এ দুটি খাত আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে; সন্দেহ নেই। কিন্তু আগামী ১০ বছরেও কি শুধু এই দুটি চাকার ওপর ভর করে চলব? বৈচিত্র্যের কথা কাগজে-কলমে বহু বছর ধরে লেখা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। কৃষি খাতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষত উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেবা খাতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ আছে। প্রতিটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে হলে চাই সুনির্দিষ্ট কৌশল; শুধু ঘোষণা নয়। 
একটি বড় বাধার কথা না বললেই নয়– দুর্নীতি ও হয়রানি। যে উদ্যোক্তার রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই, তাঁর পক্ষে ব্যবসা শুরু করা যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধ। লাইসেন্স থেকে অনুমতি; প্রতিটি ধাপে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এ দুটি রাষ্ট্রীয় রোগ আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করে রেখেছে। অথচ ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করলেই এ সমস্যার বড় একটি অংশ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
পরিসংখ্যান বলছে, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান ধারাবাহিকভাবে কমছে। একটা সময় এই খাতের সাফল্যই ছিল আমাদের গর্বের উৎস। সেটা হারিয়ে যাওয়ার আগেই সজাগ হওয়া দরকার।
কর্মসংস্থান মানে শুধু চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর ঘোষণা নয়। লাখ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হয়; বাস্তবে তা কাগুজে বিষয়ই থাকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির আসল পথ হলো অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা। কৃষি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেবা খাত মিলিয়ে একটি খাতওয়ারি পরিকল্পনা দরকার। পাশাপাশি মানসম্মত মানবসম্পদ গড়ে না তুললে নতুন খাতেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে না। গার্মেন্টসের উচ্চ পদে যে সংখ্যক বিদেশি কর্মী আছেন, সেটি আমাদের দক্ষতার ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ এবং এ সমস্যার শিকড় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়।
বাজেটে তিনটি উপাদান– বরাদ্দ, ব্যয়ের কৌশল ও অর্থনৈতিক সংকেত। কিন্তু আমাদের বাজেট আলোচনা কেবল বরাদ্দেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাকি দুটো নিয়ে কথা হয় না বললেই চলে। একটি কার্যকর বাজেট কেবল খাতওয়ারি অর্থ বিতরণের তালিকা নয়। এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন ও অগ্রাধিকারের প্রকাশ। সরকারের কার্ড কার্যক্রম– ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড। এসব উদ্যোগ হিসেবে ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত না করলে সুফল সীমিতই থাকবে। দক্ষতা, সমন্বয় ও সময়মতো সিদ্ধান্ত– এই তিনটি চ্যালেঞ্জই এখন সত্যিকারের পরীক্ষা।
এবারের বাজেটে সব সমস্যার সমাধান হবে না। এটি বাস্তবসম্মত প্রত্যাশাও নয়। কিন্তু অন্তত সংকেতটা যেন স্পষ্ট থাকে– সংস্কারের পথে সরকার হাঁটতে প্রস্তুত; বাস্তবতাকে সে স্বীকার করছে এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে বাজেটের সংযোগ আছে। যে সংকেত বিনিয়োগকারীকে আশা দেবে; উদ্যোক্তাকে সাহস জোগাবে এবং সাধারণ মানুষকে বোঝাবে যে, রাষ্ট্র তাদের কথা ভাবছে। বাজেটের আকার নয়; এই সংকেতের জোরটাই আসল।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)
