লেবাননে মৃত্যু
দীপালিরা কেন গ্রাম ছাড়ে?
পাভেল পার্থ
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ১০:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের দীপালি। অভাব ঘুচাতে কাজ করতে গিয়েছিলেন লেবানন। ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তা লেবাননেও আঘাত হানে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল লেবাননের বৈরুতের একটি ভবনে কাজ করার সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত হন দীপালি বেগম। রফিক হারিরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর এক মাস পর তাঁর লাশ আসে বাংলাদেশে। ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট, পরিবহন– সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। যুদ্ধের ভেতর দিয়েই বৈরুত থেকে বাংলাদেশে আসে লাশ। ৭ মে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পরিবারের কাছে লাশ তুলে দেওয়া হয়।
সহজে যাওয়া যায় না দীপালির গ্রামে। লাশবাহী গাড়ি প্রথম দোহারের মৈনট ঘাটে পৌঁছে গভীর রাতে। লাশ নিয়ে ভোরের অপেক্ষা করেন স্বজনরা। সকালে ট্রলারে লাশ পৌঁছে চরভদ্রাসনের আদারচর ঘাটে। ঘাট থেকে ঘোড়ার গাড়িতে দীপালিকে আনা হয় হরিরামপুর ইউনিয়নের পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের বাড়িতে।
দীপালির লাশ যে কষ্টকর পথ দিয়ে বাড়ি ফিরেছে; জীবন্ত দীপালিকে এই কষ্টকর পথ মাড়িয়েই বাড়ি থেকে বৈরুত যেতে হয়েছে। এক ‘বেওয়ারিশ লাশ’কে গ্রামে পৌঁছানো– সেলিম আল দীন তাঁর ‘চাকা’ নাটকে এক দীর্ঘতর শবযাত্রার বিস্তার করেছেন। কিন্তু ইরান-মার্কিন যুদ্ধে নিহত দীপালির লাশ ‘বেওয়ারিশ’ ছিল না; তাঁর ঠিকানা ছিল। তাঁর জন্য পরিবার, গ্রাম এবং রাষ্ট্র অপেক্ষারত ছিল। দীপালির লাশ গ্রামে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে গ্রামবাসী। কিন্তু গরিবি যন্ত্রণার চাপে যখন দীপালি গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন, তখন কি কেঁদেছিল গ্রাম? দীপালিরা কেন গ্রামে থাকতে পারেন না, এই প্রশ্ন কি রাষ্ট্র খুঁজে দেখার দায়বোধ করেছে কখনও? দীপালির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আজ যখন প্রতিমন্ত্রী এক মাস ধরে পরিশ্রম করলেন; গ্রামেই দীপালিদের কর্মক্ষেত্র তৈরি ও নিরাপদ রাখতে মন্ত্রীরা কেন সক্রিয় হন না?
কেবল দীপালি নন; ইরান যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ছয় বাংলাদেশি নাগরিক। আহত হয়েছেন বহুজন। নিরাপত্তা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থির হয়ে আছে প্রবাসী শ্রমিকের জীবন। মৌলভীবাজারের গাজীটেকার সালেহ আহমেদ কাজ করতেন দুবাইতে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের হামলা শুরু হলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আছড়ে পড়ে আমিরাতে। সেই হামলাতেই নিহত হন সালেহ আহমেদ। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুরের মোহাম্মদ তারেক কাজ করতেন বাহরাইনে। ২০২৬ সালের ২ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মানামার কাছে একটি সামুদ্রিক জাহাজে কর্মরত অবস্থায় নিহত হন তিনি। এ ঘটনায় আহত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমিনুল ইসলাম, পাবনার রবিউল ইসলাম, নোয়াখালীর মাসুদুর রহমান ও কুমিল্লার দুলাল মিয়া।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের বাঁশহাটি মাঝিরকোণা গ্রামের মো. রিয়াদ রশিদ ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় সম্প্রতি ৮ মে মারা যান। এই হামলায় নরসিংদীর লিমন দত্ত পা হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মারা গেছেন আরেক বাংলাদেশি ও নাইজেরিয়ার নাগরিক। ২০২৪ সালে চাকরি নিয়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন রিয়াদ। কিন্তু পরিবারকে না জানিয়ে ৭ এপ্রিল আরও বাংলাদেশিদের সঙ্গে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন রিয়াদ। যুদ্ধে প্রায় তিন লাখ ২৫ হাজার সৈন্য হারানোর পর রাশিয়া নানাভাবে বাংলাদেশসহ গরিব দেশের তরুণদের দিয়ে সেনাবাহিনী ভরাটের চেষ্টা করছে। ফেসবুকে নানা মিথ্যা প্রলোভনের বিজ্ঞাপন দিয়ে নিশানা করা হচ্ছে গরিব পরিবারের বেকার তরুণদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের আকরাম হোসেনও ২০২৫ সালের এপ্রিলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হন। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার মোহন মিয়াজী ফেসবুকে কাজের বিজ্ঞাপন দেখে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাশিয়ায় যান এবং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের মরদেহ বহন করতে হতো তাঁকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে জীবন নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি।
যা হোক, দীপালিরা কেন গ্রাম ছাড়ে– এই মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা ছাড়া দীপালিদের জীবনের সুরক্ষা অসম্ভব। চা বাগানের আরেক দীপালির কথা মনে আছে? জুলাই অভ্যুত্থানের পর হবিগঞ্জের ন্যাশনাল টি কোম্পানির চণ্ডী চা বাগানে ৬ সপ্তাহ ধরে মজুরি না পেয়ে অনাহারে ছিলেন চা শ্রমিকরা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মজুরির জন্য শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ সমাবেশে চা শ্রমিক দীপালি মুণ্ডা বলেছিলেন, দেড় মাস ধরে কোনো মজুরি ছাড়া আমরা না খেয়ে আছি। এভাবে চললে আমরা না খেয়ে মারা যাব।
নড়াইলের লোহাগড়ার আরেক দীপালি। এই দীপালি রানী সাহাকে ২০২২ সালে সাম্প্রদায়িক আগুনে বসতি ও সংসার অঙ্গার হওয়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। আরেক দীপালি নীলফামারীর ডিমলার দীপালি রানী রায়। ২০০৫ সলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পারিবারিক নির্যাতনে মারা যান। আরেক দীপালি রানী কর্মকারের চরম দারিদ্যের গল্প প্রকাশিত হয়েছিল গণমাধ্যমে, যার স্বামী ঝালাই কারখানায় কাজ করতেন। সন্তানদের নিয়ে প্রায় দিনই না খেয়ে থাকতে হতো তাদের। দেশব্যাপী সব দীপালির গল্পই কাঠামোগত বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং ভঙ্গুর উৎপাদন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খল দৃশ্য হাজির করে।
আরেক দীপালির গল্প জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি, ২০২৪) ‘সারভাইভার টু রোল মডেল’ হিসেবে এক প্রান্তিক নারীর ক্ষমতায়নের উদাহরণ হিসেবে প্রকাশ করেছে। গাজীপুরের এই দীপালি রানী মণ্ডল মাটি কাটার দিনমজুরি করতেন। সইতে হয়েছে নির্মম অত্যাচার। পরে একটি গার্মেন্টে কাজ পান। মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন পেলেও তাঁকে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন, কেন দীপালি বা দেশের কৃষিজীবী গ্রামীণ নারীর গন্তব্য কি কেবলমাত্র গার্মেন্ট কিংবা যুদ্ধ জারি থাকা প্রবাস জীবন? সবুজবিপ্লব প্রকল্পের মাধ্যমে চুরমার হওয়া গ্রামীণ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরেই এর উত্তর আড়াল হয়ে আছে।
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
[email protected]
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ
