ইসলাম ও সমাজ
জিলহজ ও মুমিনের প্রস্তুতি
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
জিলহজ মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি হিজরি বছরের দ্বাদশ ও শেষ মাস। এ মাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে অনেক ইবাদত, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির অনন্য সুযোগ। পবিত্র হজ, কোরবানি, আরাফার দিন এবং তাকবিরে তাশরিক– সবই এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ জিলহজ মাসের গুরুত্ব তুলে ধরে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ফাজরের ১-২ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।’ তাফসিরকারকরা বলেন, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ যখন কোনো কিছুর শপথ করেন, তখন বুঝতে হবে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ।
জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নিকট জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নয়।’ (সহিহ, বুখারি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জিলহজের প্রথম দশ দিনের ইবাদত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা ও তওবা-ইস্তিগফার এসব আমল এ সময়ে অধিক সওয়াবের কারণ হয়।
জিলহজের ৯ তারিখ হলো ইয়াওমে আরাফা বা আরাফার দিন। হজ পালনকারীরা এদিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। যারা হজে যাননি, তাদের জন্যও এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোজা আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম)
এদিন বেশি বেশি দোয়া, তাওবা, ইস্তিগফার ও আল্লাহর জিকির করা উত্তম। কারণ আরাফার দিন দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়।
জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা পালিত হয় এবং কোরবানি করা হয়। কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবাই করা। এটি হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি বহন করে।
জিলহজ শুরু হওয়ার আগেই কোরবানিদাতাদের জন্য চুল, নখ কেটে ফেলা মুস্তাহাব। উম্মে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি করবে, জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে তারা যেন চুল, নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)
জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো– ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’ এই তাকবির মুসলিম উম্মাহর ইমানি চেতনা জাগ্রত এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে।
জিলহজ মাসের সবচেয়ে বড় আমল হজ। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ আদায় করা ফরজ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসলমান এ সময় পবিত্র মক্কা নগরীতে সমবেত হন। হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। জিলহজ মাস মানুষকে আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। এ মাসে একজন মুসলমান নিজের গুনাহের জন্য তওবা, অন্যের হক আদায় এবং আল্লাহর পথে চলার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে।
জিলহজ অফুরন্ত রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস। এ মাসের প্রথম দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে গণ্য। হজ, কোরবানি, আরাফার রোজা, তাকবির ও বিভিন্ন নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ পায়।
তাই আমাদের উচিত জিলহজ মাসকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, বেশি বেশি ইবাদত এবং ত্যাগ ও তাকওয়ার শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে জিলহজ মাসের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
