ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্য এবং ইরান ও তাইওয়ানের ত্রিভুজ

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্য এবং ইরান ও তাইওয়ানের ত্রিভুজ
×

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ১৬:৫১

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলের সামনে ব্রাস ব্যান্ড বাজছে। শিশুরা আমেরিকান ও চীনা পতাকা নাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯ বছর পর প্রথমবারের মতো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেইজিংয়ে পা রাখলেন। সঙ্গে টিম কুক, ইলন মাস্ক, জেনসেন হুয়াং– আমেরিকান পুঁজিবাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখগুলো। আর অপরপ্রান্তে শি জিনপিং; স্থির, সংযত, ঐতিহাসিক ধৈর্যের মূর্তিমান প্রতিচ্ছবি। দৃশ্যটা যতটা আনুষ্ঠানিক, ততটাই প্রতীকী।

এই শীর্ষ বৈঠক নিয়ে দুনিয়াজুড়ে প্রত্যাশা ছিল বিপুল। মার্কিন মিডিয়া এটিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক’ বলতে দ্বিধা করেনি। ট্রাম্প নিজেও ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ‘দুই দেশের জন্য অসাধারণ সব ঘটনা ঘটবে!’ কিন্তু দুই দিনের ঝাঁজালো আলোচনা, গভীর রাতের ডিনার আর হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ শেষে প্রশ্নটা থেকেই গেছে, আসলে কী হলো?

বাণিজ্য ছাড়ের আড়ালে শক্তির খেলা
ট্রাম্প বেইজিং থেকে ফেরার পথে সাংবাদিকদের বললেন, ‘একটি চমৎকার বাণিজ্যিক লেনদেন’ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যে তালিকা পাওয়া গেছে, সেটা মোটেই উত্তেজনাপূর্ণ নয়।
চীন ৪০০টি আমেরিকান মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের আমদানি লাইসেন্স নবায়ন করেছে। চীন বলেছে যে, তারা আমেরিকার তেল কিনতে আগ্রহী। শি রাজি হয়েছেন ২০০টি বোয়িং জেট কিনতে। আর দুই নেতা একসঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে। এতটুকুই।
কোনো বিরল খনিজ চুক্তি হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের কোনো চুক্তি হয়নি। এনভিডিয়ার এইচ ২০০ চিপ বিক্রির অনুমোদন ঘোষিত হলেও চীন তার নিজের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে যেমন– আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইটড্যান্স– সেই চিপ না কেনার নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। ফলে ঘোষণাটি ফাঁপাই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে একটি কাঠামোগত সত্য আছে– ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায় বাণিজ্যে চীনের হাতই এখন শক্তিশালী। বিরল খনিজের ৮৫ শতাংশ পরিশোধন নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে, আর সেই খনিজ ছাড়া এফ-৩৫ থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর চিপ পর্যন্ত কিছুই তৈরি করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাটিই মূলত ট্রাম্পকে বেইজিংয়ে টেনে এনেছে।
চীন তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করতে আগ্রহী নয়। তারা সবকিছু ঝুলিয়ে রাখছে এবং সঠিক সময়ে দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই টেবিলে শি এগিয়ে, কারণ তিনি বিক্রি করতে আসেননি; সে কারণে অপেক্ষা করতে পারেন।

মধ্যপ্রাচ্যের আগুন প্রশান্ত মহাসাগরে ছায়া ফেলছে
এই বৈঠকে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মাত্রা যোগ করেছে ইরান ইস্যু। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই যুদ্ধ এখনও চলছে এবং সেটি ট্রাম্পের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে ইরানের প্রসঙ্গ তাঁর প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি আলোচনায় এসেছে।
শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সাহায্য করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। দুই নেতা একমত হয়েছেন যে ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।
কিন্তু এই সম্মতির আড়ালে একটি কৌশলগত হিসাব কাজ করছে। চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেলের ক্রেতা এবং এই সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো কারণ তাদের নেই। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ আর্থার ডং বলেছেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সম্পদ ব্যয় হওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষত তাইওয়ান প্রশ্নে, আমেরিকা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘এটি চীনের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করছে।’
অর্থাৎ চীন একই সঙ্গে দুটি কাজ করছে, ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আটকে রাখার কৌশলগত পরিবেশ বজায় রাখছে। এটি অত্যন্ত সুচতুর এক কূটনৈতিক চাল।

টেবিলের নিচে জ্বলন্ত প্রশ্ন

এই পুরো বৈঠকে সবচেয়ে তীব্র মুহূর্তটি এসেছিল প্রথম দিন। শি জিনপিং সরাসরি বললেন, ‘তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ পর্যন্ত হতে পারে।’ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। ট্রাম্প এই মন্তব্যের সরাসরি জবাব দেননি। তিনি আলোচনাকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন বাণিজ্যের দিকে।
আরও উল্লেখযোগ্য হলো, হোয়াইট হাউসের বৈঠকের সারসংক্ষেপে তাইওয়ানের কোনো উল্লেখই ছিল না। অথচ চীনের বিবৃতিতে এটি কেন্দ্রীয় স্থান পেয়েছে।
তাইওয়ান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদন হয় তাইওয়ানে। টিএসএমসি একাই বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন, গাড়িশিল্প এবং সামরিক প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ২০৪০ সালের প্রযুক্তিকৌশল পুরোটাই তাইওয়ানের এই উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। চীনের জন্যও তাইওয়ান একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে, কৌশলগত অবস্থানের প্রশ্নে এবং প্রযুক্তিগত ব্যবধান ঘোচানোর প্রশ্নে।
এই বৈঠকের পর তাইওয়ানের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, তাদের ভবিষ্যৎ যেন দুই মহাশক্তির দরকষাকষির টেবিলে বিনিময়ের পণ্য না হয়ে ওঠে। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন নীতি ‘অপরিবর্তিত’ থাকবে। কিন্তু ট্রাম্প বিমানে ফেরার পথে বলেছেন, ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ নিয়ে তিনি এখনও ‘সিদ্ধান্ত নেননি’। সেই অনিশ্চয়তাটুকুই বেইজিংয়ের জন্য যথেষ্ট।

থুসিডিডিস তত্ত্ব ও দুই পরাশক্তির খেলা
বৈঠকের একটি মুহূর্তে শি জিনপিং প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের কথা উল্লেখ করেছেন, একটি উদীয়মান শক্তি যখন প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই তত্ত্বটি উদ্ধৃত করে তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন, আমরা এই ফাঁদের কথা জানি, তাই সাবধানে থাকতে হবে। 

বৈঠকের পরিবেশ ছিল উষ্ণ। শি বললেন, ‘একটি স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুরো বিশ্বের জন্য ভালো।’ ট্রাম্প শি-কে সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানালেন। করমর্দন হলো, কিছু সীমিত চুক্তি হলো, ছবি উঠল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিছুই মেটেনি। সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ এআই প্রতিযোগিতা, বিরল খনিজের কূটনীতি, তাইওয়ানের অনিশ্চয়তা, এগুলোর কোনোটাই এক বৈঠকে সমাধানযোগ্য নয়। এটা দুই পরাশক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কট কেনেডি বলেছেন, ‘চীন এই বৈঠকে ২০১৭ সালের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। সে বছর চীন মার্কিন শুল্কের সামান্য বৃদ্ধিকেও ভয় পেত। এখন তারা ট্রাম্পের বেশির ভাগ পদক্ষেপকে নিরাপদ করে দিতে সক্ষম।’
এই শক্তির বদল আসলে গত দশ বছরের ফসল। চীন এই দশ বছরে নিজস্ব প্রযুক্তি, নিজস্ব সাপ্লাই চেইন এবং নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে। ট্রাম্প মাংস লাইসেন্স, সয়াবিন আর বোয়িং অর্ডার নিয়ে খুশি হচ্ছেন, আর শি পাচ্ছেন সেই সময়– যা চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

ছবির রাজনীতি ও বাস্তবের হিসাব

ট্রাম্প পেয়েছেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য এই বৈঠকের কিছু ছবি আর শি পেয়েছেন সময়। এই বৈঠকে কোনো যুদ্ধ থামেনি, কোনো ঐতিহাসিক চুক্তি হয়নি, তাইওয়ানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়নি। যা হয়েছে তা হলো, উভয় পক্ষ উত্তেজনা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ধরে রেখেছে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। মূল বার্তাটা হলো, এই দুই দেশ প্রতিযোগী, কিন্তু তারা এখনও একে অপরের প্রয়োজনের অংশ।
শেষ পর্যন্ত এটি এক ধরনের চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে দুই পক্ষই জানে খেলাটা কোথায়, কোন দিকে যাচ্ছে, কিন্তু কেউই থামতে পারছে না। শক্তির এই দাবার বোর্ডে এই মুহূর্তে কে এগিয়ে, সেটা হয়তো আর প্রশ্নই নয়, সবার জানা।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×