ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

ইতিহাস কার সঙ্গে কার বিভেদ ঘটায় 

ইতিহাস কার সঙ্গে কার বিভেদ ঘটায় 
×

আদনান মনোয়ার হুসাইন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ১৮:৪৩

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখলে এবারের জাতীয় সংসদ ব্যাপক ব্যতিক্রমী বটে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে এসে মহান জাতীয় সংসদে যারা বিরোধী দলের আসনে বসেছে তাদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে এই সংসদেই চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলে রয়েছে একজন বীর উত্তমের হাতে গড়া দল, রয়েছেন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই সংসদেই বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, একই সঙ্গে শোক প্রকাশ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের জন্য। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তার দায়ে জামায়াতের তীব্র সমালোচনাও হয়েছে, আবার তাদের সঙ্গে ‘পিঁপড়ার বলের মতো’ এক হয়ে থাকার আহ্বান এসেছে সরকারি দল থেকেই।

১২ মার্চ শুরু হওয়া উদ্বোধনী অধিবেশনে সরকারি দল ব্যস্ত ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশগুলো পাস করা নিয়ে। বিরোধী দল ও মিত্ররা কয়েকটি ওয়াকআউট আর রাষ্ট্রপতি, সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে কিছু গরম বক্তব্য দিলেও সরকারি দলের তাতে হেলদোল দেখা যায়নি। কিন্তু ২৮ এপ্রিল যেন সব বাঁধ ভেঙ্গে পড়ে। এদিন বর্ষীয়ান রাজনীতিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না।’ তাঁর এ বক্তব্য যেন বহুদিনের বন্ধ অর্গল খুলে দেয় বিএনপির এমপিদের। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত অধিবেশনের শেষ ৩ দিনে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এমপি মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতার প্রসঙ্গ টেনে এমন সমালোচনা করেন যা এককথায় বিরল এবং অভূতপূর্ব। দশকের পর দশক ধরে চলা ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ও নির্ভরশীলতার মধ্যে জামায়াতের কোনো সমালোচনা বিএনপির শিবিরে অন্তত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। 

হামে শিশুমৃত্যু, জ্বালানি সংকট, অন্যায্য মার্কিন চুক্তির মতো বিষয় রেখে স্বাধীনতার এত বছর পর জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধ যে উত্তাপ ছড়ালো তা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধই যে জাতির মূল সূর, নানা বয়ান দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতো নয় এবং যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে যেকারো নাড়িনক্ষত্র ধরে টান দেওয়ার মতো তাজা ইতিহাস- অধিবেশনটি যেন সেটিই বুঝিয়ে দিয়েছে। 

পক্ষান্তরে, মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা, কে কোন পক্ষ- তা নিয়ে এতবছর পরও এমন আলোচনা চলতে পারাটা রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতৃত্বের দৈন্যও প্রকাশ করে। জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন ঘিরে দলগুলোর মধ্যে সাধারণ বোঝাপড়া গড়ে না ওঠা, এটিকে মীমাংসিত ইস্যুর জায়গায় রাখতে না পারার ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না । 
সংসদে বিএনপির এমপিরা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো মিত্রের হঠাৎ চেহারা পাল্টে যাওয়ায় মিত্রতার যে শুভঙ্করের ফাঁকিটি প্রকাশ পায় তা নিয়ে আগেই মাঠে নেতাকর্মীরা ক্ষোভ দেখিয়েছেন। দলের রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের কারণে দীর্ঘকাল চুপ থাকতে বাধ্য হলেও তাদের মনোভাবটা কী, সুযোগ পেয়েই এমপিরা সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন। বিষয়টি দলটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে। 

জামায়াতের ইতিহাস নিয়ে এমন ঘাঁটাঘাটি করত আওয়ামী লীগ। সেটিকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা বলা হতো। এখন বিএনপি সংসদে জামায়াতের এমন সমালোচনা করার পর ভবিষ্যতে তাদের কি আর জোটবদ্ধ হওয়ার মুখ থাকে? এতদিন দল দুটির মধ্যে আওয়ামী লীগকে মাথায় রেখে পরস্পরের বিরোধিতায় একটি অদৃশ্য লাইন অতিক্রম না করার প্রবণতা দেখা গেছে। এমপিরা কি সেই লাইন ভেঙ্গে দিয়েছেন? দল দুটি সেটি মেরামত করতে চাইলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা সাধারণ ভোটাররা কি মানতে পারবেন? যে ইতিহাস সংসদে উচ্চারিত হয়েছে তার বিপরীত বয়ান তৈরি করতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে নিশ্চিত।

অন্যদিকে, জামায়াত তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা সরাসরি অস্বীকার করেনি, স্বীকার করে ক্ষমাও চায়নি। বরাবরের মতোই তারা আশ্রয় নিয়েছে বাকচাতুর্যের। ‘একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল আল্লাহই জানেন’, ‘ইতিহাসের মাস্টার হতে আসিনি’, ‘এই জামায়াত আর সেই জামায়াত এক নয়’ বা ‘আমিও শিশু মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম’ ধরনের হেঁয়ালিতে তাচ্ছিল্য দেখিয়ে গেছে তারা। 

বিএনপির এমপিদের প্রবল সমালোচনার মধ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টাও ছিল প্রকাশ্য। মুক্তিযুদ্ধর ইতিহাস টেনে জাতিকে বিভক্ত না করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিএনপি ও জামায়াতকে নিজেদের রক্ষায় ‘পিঁপড়ার বলের মতো’ ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন। অবশ্য তিনি কোন মুসিবতে পড়ার আশঙ্কা করছেন তা বলেননি। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেমিশে চলার নজির ছিল ২০১৪ ও ২০২৪ এর সংসদে। এবারের সংসদও কি তেমন কিছু, তাও স্পষ্ট হয়নি। 

স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে দুই নৌকায় পা দেওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। ভবিষ্যতে পানি না ছুঁয়ে মাছ ধরা আর সম্ভব না-ও হতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাপ্রবাহের জনপ্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ আরও মহীয়ান ও সর্বব্যাপী হয়ে ওঠারই ইঙ্গিত দিয়েছে। 

আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×