শাহ আলীর মাজার
রাজধানীতেই এমন হামলা!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১৩:১৫
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সৃষ্টি করিয়া বিভিন্ন মাজার ও খানকায় হামলা-ভাঙচুরের যে ভয়ংকর ধারা সূচিত হইয়াছিল, উহা আর বন্ধ হইল না। উপরন্তু এতদিন ঢাকার বাহিরের বিভিন্ন এলাকার মাজার ও দরবারে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিলেও এইবার খোদ রাজধানীতে পাঁচ শতাধিক বৎসরের প্রাচীন একটি মাজার এহেন ন্যক্কারজনক হামলার শিকার হইল। শনিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলীর মাজারে বৃহৎ আকারের অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এই রকমই এক অনুষ্ঠান চলাকালে লাঠিসোটা লইয়া মাজারে হামলা চালায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হইয়াছেন। যাহা দুর্ভাগ্যজনক, এই হামলা ঘটিয়াছে একেবারে সরকারের নাসিকার অগ্রভাগে। ইতোমধ্যে মব সহিংসতায় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ মাথায় লইয়া অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় লইয়াছে। তৎস্থলে ক্ষমতাসীন একটি নির্বাচিত সরকার, যাহারা শপথ গ্রহণ করিয়াই মব সহিংসতা নির্মূলের ঘোষণা দিয়াছিল।
স্মরণ করা যাইতে পারে, গত ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় এক পীরের দরবার মব সৃষ্টির মাধ্যমে আগুনে পোড়াইয়া দেওয়া হয়। হামলাকারীরা এমনকি পীরকেও প্রহার করিয়া খুন করে। ঐ ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলা আখ্যা দিয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপরাধীদের চিহ্নিত করিয়া আইনের আওতায় আনয়নের ঘোষণা দিয়াছিলেন। তবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ব্যতীত সেই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ঘটে নাই অদ্যাবধি। আমরা মনে করি, সরকার যদি উক্ত ঘটনার হোতাদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণে দৃঢ়তা প্রদর্শন করিত, তাহা হইলে শাহ আলীর মাজারে উহার পুনরাবৃত্তি ঘটিত না। উপরন্তু স্থানীয় পুলিশ সক্রিয় থাকিলেও হামলাকারীরা এতটা দুঃসাহস পাইত না। এই প্রেক্ষাপটে সরকার আলোচ্য সহিংসতার দায় উপেক্ষা করিতে পারে না। ইহাও উল্লেখ্য, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও তাহার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ছিল বলিয়া ভুক্তভোগী অনেকে অভিযোগ করিয়াছেন, যদিও জামায়াত তাহা চিরাচরিত পন্থায় অস্বীকার করিয়াছে। কুষ্টিয়ায় পীরের দরবারে ভাঙচুর ও পীর হত্যার ঘটনায়ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠিয়াছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যেও উহারা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ঐ ঘটনায়ও জামায়াত স্বীয় দায় অস্বীকার করিয়াই দায়িত্ব শেষ করিয়াছে। অথচ সংসদের বিরোধী দলরূপে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সরকার, তৎসহিত তাহাদেরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
আমরা জানি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও ইসলামের বিভিন্ন তরিকা আছে। এখানে যদ্রূপ কট্টরপন্থা আছে, দেশের রাজনীতিতে যাহার অনুসারীরা আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমবর্ধমান হারে প্রভাব বিস্তার করিতেছে, তদ্রূপ রাজনীতির সহিত একেবারেই সম্পর্কহীন নিছক সাধনানির্ভর সহজিয়া ইসলামপন্থিরাও আছে। যাহারা মাজার-খানকাকেন্দ্রিক প্রার্থনা বা জীবনচর্চায় যুক্ত, মূলত তাহারাই শেষোক্ত ধারার ইসলামের ধারক। সহস্র বৎসর ধরিয়া এই দেশে সিনক্রিয়েটিস্টিক বা সমন্বিত ধারার যে সংস্কৃতি গড়িয়া উঠিয়াছে, উহাতে এই ধর্মপ্রচারক এবং তাহাদের অনুসারীদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। ফলে খানকা, মাজার এবং উহার অনুসারীদের উপর হামলা সমাজে শুধু ঘৃণার চাষই বৃদ্ধি করিবে, মানুষের কোনো কল্যাণ ঘটাইতে পারিবে না।
মাজার সংস্কৃতি লইয়া আলেম-ওলামার মধ্যে বিতর্ক থাকিতে পারে। যদ্রূপ সুন্নি, শিয়াসহ ইসলামের বিভিন্ন ধারা-উপধারা লইয়াও বিতর্ক আছে। কিন্তু সহিংসতা নহে, কেবল যুক্তি-প্রতিযুক্তিই সেই বিতর্কের নিরসন করিতে পারে। এই বিষয়টি যদ্রূপ সংশ্লিষ্ট সকলকে বুঝিতে হইবে, তদ্রূপ সরকারকেও রাষ্ট্রের অভিভাবকরূপে যে কোনো সহিংসতার ন্যায় মাজার-দরবারে হামলা শক্ত হস্তে দমন ও প্রতিরোধ করিতে হইবে।
