ইসলাম ও সমাজ
হজ ও কোরবানি: ত্যাগের মহিমা
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হজ। এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়।
হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প করা। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়মে পবিত্র কাবা শরিফ ও সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো জিয়ারত ও ইবাদত পালন করাকে হজ বলা হয়। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ আদায় করা ফরজ। মহান আল্লাহ সুরা আল ইমরানের ৯৭ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ।’
হজ ইসলামের ঐক্য, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য উদাহরণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও বর্ণের মুসলমান একই পোশাকে একত্র হয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়। এতে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ দূর হয়।
হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীল ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।’ –সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫২১
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, হজ মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে এবং গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম।
হজ মানুষের মধ্যে ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে। ইহরাম পরিধানের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে, মৃত্যুর পর সবাইকে সাদা কাপড়ে কাফন পরিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে। আরাফাতের ময়দান কিয়ামতের দিনের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা লাভ করে।
হজ মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ করা। ইসলামী শরিয়তে জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানির মূল ইতিহাস জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের ঘটনার সঙ্গে। মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত হন। তখন আল্লাহ তাঁর আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ –সুরা কাউসার, আয়াত-২
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিনের আমলের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো পশু কোরবানি করা।’ –জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩।
কোরবানির মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করলে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। হজ ও কোরবানি উভয়ই ত্যাগের শিক্ষা দেয়। হজে মানুষ নিজের অর্থ, সময় ও আরাম ত্যাগ করে আল্লাহর ঘরে উপস্থিত হয়। কোরবানিতে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় সম্পদ ব্যয় করে। উভয় ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন।
হজ ও কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইবাদত। এগুলো মানুষের আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। বর্তমান সমাজে হজ ও কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। কেউ কেউ লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে এসব ইবাদত পালন করে। অথচ ইসলাম আন্তরিকতা ও তাকওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। হজ ও কোরবানি মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করে তাকে সত্যবাদী, বিনয়ী ও মানবপ্রেমী বানানোর শিক্ষা দেয়। আমাদের উচিত হজ ও কোরবানির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবসেবার মানসিকতা গড়ে তোলা।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
