রাজধানী
টেকসই বিকল্প ছাড়া হকার উচ্ছেদ সফল হবে?
মো. মাসুদ পারভেজ রানা
মো. মাসুদ পারভেজ রানা
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১১:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটলে এখন এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। ফুটপাত অনেকটাই ফাঁকা, যানবাহনের গতি তুলনামূলক স্বাভাবিক আর পথচারীদের চলাচলেও আগের মতো বাধা নেই। যানজটমুক্ত ঢাকা অনেকের কাছে এখনও কল্পনাতীত। তবে একথা অনস্বীকার্য, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে হকার উচ্ছেদ অভিযানে জোর দেওয়ায় সেখানে একটি পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলিত নগরের ছবি ফুটে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই উদ্যোগ নগরবাসীকে অনেক স্বস্তি দিয়েছে। তবে দৃশ্যমান এই উন্নয়নের আড়ালে রয়ে গেছে আরেকটি বাস্তবতা।
ফুটপাত ও রাস্তার পাশে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে আসা হাজারো হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ী এক নিমেষেই হারিয়ে ফেলছেন তাদের জীবিকার উৎস। যেসব ব্যবসায়ীর আয় ছিল দিন আনা দিন খাওয়ার মতো, তাদের জন্য এই উচ্ছেদ শুধু ব্যবসা হারানো নয়; বরং পুরো জীবন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার শামিল। এটি শুধু আয়ের উৎস বন্ধ করে দেয়নি, তাদের সামাজিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
দেশের নগরজীবনে হকাররা নতুন কেউ নয়। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ফল, সবজি, পোশাক, বই, খাবার কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করে এই মানুষগুলো দশকের পর দশক ধরে নগরের অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। অল্প পুঁজি, পারিবারিক শ্রম আর অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই ব্যবসা গড়ে উঠেছে। গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র মানুষ, কর্মসংস্থানের অভাবে শহরমুখী যুবক কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারই হকারিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে বেঁচে থাকার পথ হিসেবে।
নগর কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত না করলে যানজট কমানো যাবে না, দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে আর শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হবে। নিশ্চিত করেই এই যুক্তির বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত হকারি ব্যবস্থার ফলে অনেক জায়গায় পথচারীদের চলাচল ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, হকারদের স্বার্থ কতটা দেখা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের বিকল্প উপায় বা জীবিকার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সেই আশ্বাস এখনও স্পষ্ট রূপ পায়নি। কবে পুনর্বাসন হবে, কোথায় বসতে পারবে বা কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে–এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও পায়নি। ফলে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে।
এসব বিবেচনা করলে দেখা যায়, এখানে মূল সমস্যা হলো অগ্রাধিকারে। কোনটি আগে–নগর উন্নয়ন নাকি হকার উচ্ছেদ, নাকি দুটি একসঙ্গে? আমার মতে, নগর উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি, কিন্তু উন্নয়নের আগে মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমান জরুরি। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করলে তা মানবিক উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যদি বড় একটি জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, হকার সমস্যা সমাধানে কেবল শক্ত হাতে উচ্ছেদ কার্যকর পদ্ধতি নয়। নগর অর্থনীতিতে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং নির্ভরশীলদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এ জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশে হকারদের নগর অর্থনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনে বলা আছে, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না। বিকল্প হিসেবে নগরের নির্দিষ্ট এলাকায় ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসার সুযোগ রেখে পরিবহন ব্যবস্থা ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে যেন কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একসময় ব্যাপক উচ্ছেদ হলেও পরে কর্তৃপক্ষ শহরের বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত হকার জোন চালু করেছে, যেখানে সময়ভিত্তিক ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরের হকার সেন্টার মডেলও উল্লেখযোগ্য। হকারদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এই মডেল বা ধারণাটি শুধু হকারদের জীবিকা রক্ষা করেনি, বরং হকার সেন্টার একটি সাংস্কৃতিক ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু শহরে হকারদের জন্য পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যমে অনেক হকারকে ধীরে ধীরে অন্য পেশায় যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এসব উদাহরণ পরিষ্কারভাবে বলে দেয়, একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ থাকলে নগর উন্নয়ন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন সমাধান অসম্ভব নয়। নগরের খালি জায়গা বা সিটি করপোরেশনের জমিতে নির্দিষ্ট হকার জোন, নাইট মার্কেট, সিটি মার্কেট কিংবা অস্থায়ী বাজার তৈরি করা যেতে পারে। আবার যারা পেশা বদলাতে আগ্রহী, তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটি অবশ্যই হতে হবে উচ্ছেদ অভিযান এবং বিকল্প জীবিকা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হকারদের সঙ্গে কথা বলা। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকলে সিদ্ধান্ত একপেশে হয়ে যাবে। আলোচনার মাধ্যমে সময়সূচি, স্থান নির্বাচন এবং বিকল্প ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে পারলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং গৃহীত কর্মসূচির বাস্তবায়নও সহজ হবে।
যাহোক, ঢাকা ও অন্যান্য শহরের রাস্তা পরিষ্কার হওয়া নিশ্চয়ই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু উন্নয়নের সাফল্য শুধু ফাঁকা ফুটপাতে নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তায়ও মাপা উচিত। হকার উচ্ছেদ যদি হাজারো পরিবারকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, তবে তার সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। নগর উন্নয়ন বনাম জীবিকা–এই দ্বন্দ্বে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। নগরকে শৃঙ্খলিত ও পরিকল্পিত করতে হলে মানুষের জীবনকেও নিরাপদ ও সম্মানজনক রাখতে হবে। বিকল্প ছাড়া উচ্ছেদ নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনাই পারে একটি সুন্দর, মানবিক ও টেকসই নগরের ভিত্তি গড়ে দিতে।
ড. মো. মাসুদ পারভেজ রানা: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
