সমকালীন প্রসঙ্গ
পশু কোরবানিতে কেন এগিয়ে বাংলাদেশ
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:৪২
পশু কোরবানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাওয়ার খবর রয়েছে। পাকিস্তানের চেয়েও এখানে কোরবানি দেওয়া হচ্ছে বেশি। একটা সময় পর্যন্ত দুই দেশে প্রায় সমসংখ্যক পশু কোরবানি হতো। হালে পাকিস্তান অনেকখানি পিছিয়েছে মূলত অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে। অর্থনৈতিক দুর্দশা না হলেও সংকটে আছে বাংলাদেশ। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনা গেলেও হালে এটা নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এর পেছনেও আছে ইরান যুদ্ধের প্রভাব। সেখানে যুদ্ধ আপাতত বন্ধ অবশ্য। জ্বালানি তেলের দামও কমতির দিকে।
সামর্থ্যবান মুসলিমদেরই বলা হয়েছে পশু কোরবানি দিতে। সামর্থ্য কমলে কোরবানি কমে আসাটাই স্বাভাবিক। হালে বাংলাদেশে পশু কোরবানি কমে আসার খবর রয়েছে। ছোট গরু এবং ছাগল-ভেড়া বেশি কোরবানি হচ্ছে কিনা; সেটাও দেখতে হবে। অনেকে ‘ভাগে’ কোরবানি দিচ্ছেন। পশু কোরবানির ব্যবস্থাপনায় সক্ষম না হওয়ায় অনেকে এ পথে যাচ্ছেন। ঈদে গরু-ছাগল জবাই আর মাংস তৈরির কাজ করার ‘পেশাদার’ লোকের সংখ্যাও বাড়ছে, যাদের বলা হয় ‘মৌসুমি কসাই’। এ সময়ে বাড়ে গরু-ছাগল ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড। খামার থেকে পশু সংগ্রহ করে হাটগুলোয় বিচরণ করেন তারা। ঈদুল আজহার কর্মযজ্ঞে এদের ভূমিকা বিরাট।
একটা সময় কোরবানির পশুর জন্য ভারতের ওপর কিছুটা নির্ভরশীলতা ছিল। সীমান্তপথে গরু আসায় মাংসও মিলত মোটামুটি সস্তায়। এতে উভয় দেশের উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা লাভবান ছিলেন। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এটা ঘোষণা দিয়েই বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে অবশ্য বেশি দিন সংকট পোহাতে হয়নি বাংলাদেশকে। গরুর বিরাট চাহিদা থাকায় এখানে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। ঘরে ঘরে গরু পালন তো ছিলই। দুইয়ের মিলিত কর্মযজ্ঞে গরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে বেশি সময় লাগেনি। ছাগল উৎপাদনেও আমাদের সাফল্য বিরাট। গারল, গয়াল, দুম্বা পালন করেও তোলা হচ্ছে হাটে। কেবল মহিষের উৎপাদন কমে যাওয়ার খবর রয়েছে।
এক সময় মহিষের মাংস গরু বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এর মাংসের চাহিদা ছিল কম। হালে মহিষের মাংসের নানান গুণের কথা প্রচারিত হচ্ছে। সম্ভবত এর প্রভাবে গোমাংসের চেয়ে মহিষের মাংসের দাম এখন বেশি। কোরবানির হাটেও মহিষের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। একটা সময় পর্যন্ত কেবল চরাঞ্চলে মহিষ পালা হতো। ভারত থেকেও কিছু আসত। এখন খামারেও মহিষ পালন বাড়ছে। এতে রোগবালাইসহ খরচ অপেক্ষাকৃত কম। মহিষের দুধের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান।
প্রতিবার যে হিসাব মেলে, সে অনুযায়ী ছাগল ও ভেড়া কোরবানি প্রায় অর্ধেক। এক সময় এখানে গরু কোরবানি এত কম হতো যে, ঈদুল আজহাকে ‘বকরি ঈদ’ বলা হতো। কালক্রমে গরু কোরবানি বেড়েছে। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় হালে গরু পালা হয় প্রধানত দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণ করতে। তরল দুধেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। উৎসব-পার্বণে দুধের চাহিদা হঠাৎ বাড়লেও তা সামলানো যায়। গুঁড়া দুধ উৎপাদনেও এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এতে কমবে আমদানি-নির্ভরতা। দুগ্ধ উৎপাদকদেরও এতে ভালো দাম পাওয়ার কথা। গুণমানসম্পন্ন ছাগলের দুধের বাজারও বড় হচ্ছে। বছরজুড়ে মাংসের জন্য এর চাহিদা তো রয়েছেই। ছাগলের বিখ্যাত জাত রয়েছে আমাদের। কোরবানির হাটেও এগুলোর চাহিদা বিরাট। 
কয়েক বছর ধরেই খবর দেওয়া হচ্ছে, কোরবানির উপযুক্ত গরু-ছাগল চাহিদার চেয়ে বেশি রয়েছে আমাদের। অধিক কোরবানি হলেও সংকট হবে না। প্রতি ঈদেই প্রবাসী আয় বাড়তে দেখা যায়। এর বড় অংশ যায় পশু কোরবানিতে। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে কোরবানি বেড়ে যাওয়ার এটা বড় কারণ। দেশেও এক শ্রেণির মানুষের আয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে। দেশে অস্থিরতা কম থাকলে পশু কোরবানি বাড়ে। মাঝে করোনা পরিস্থিতিতেও এ ধারা খুব ব্যাহত হয়নি। অতঃপর ইউক্রেন যুদ্ধে গোখাদ্যের দাম বাড়তে থাকলে পশুপালন নিরুৎসাহিত হয়। বালাই ব্যবস্থাপনার সংকটেও অনেক ব্যবসা মার খায়। লাভজনক দাম না পাওয়াও এ জন্য দায়ী। কোরবানির হাটে বিক্রি না হলে কসাইয়ের কাছে ভালো দাম পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়। গরু-ছাগলের অতিরিক্ত সরবরাহ পশু পালনকারীদের জন্য তাই দুশ্চিন্তারও বিষয়। তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে ঈদের সময়ে সীমান্তপথে গরু চোরাচালানের খবর মিললে। এবারও কোনো কোনো পয়েন্ট দিয়ে ‘অবাধে’ গরু আসার খবর রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আরোপিত নানা বিধিনিষেধের কারণে সেখানে গরু বেচাকেনা অনেক কমেছে। এ অবস্থায় চোরাচালান রোধে আমাদের সীমান্তরক্ষীদের বিশেষ সতর্কতা কাম্য। কোন কোন রুটে এর শঙ্কা বেশি, তা অজানা নয়। মিয়ানমার থেকেও গরু চোরাচালান যেন না হয়। ছাগল-ভেড়া চোরাচালানের কথা তেমন শোনা যায় না। এটা সংশ্লিষ্ট উৎপাদকদের জন্য স্বস্তির। এ মুহূর্তে অবশ্য কোরবানিযোগ্য গরু-ছাগলের সিংহভাগ এসে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। চোরাচালান কঠোরভাবে রোধ না হলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেকে আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না।
দেশে গোচারণভূমি অনেক কমে এসেছে। যথেষ্ট গোচারণভূমি থাকায় অনেক দেশে পশুপালন সহজ। সেখানে গরু আর মাংসের দাম কম। নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে তারা রপ্তানিও করতে পারে। সিংহভাগ ক্ষেত্রে আমাদের পশুপালন করতে হচ্ছে খামারে। এ প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল। খামারে পশুপালন কষ্টসাধ্যও বটে। ছাগল পালনে একই কথা প্রযোজ্য। এ কারণে অন্যান্য সময়ে গরু-ছাগলের মাংসের দাম যেমন বেশি; তেমনি কোরবানির সময় এর দাম যায় আরও বেড়ে। দামের কারণেই মূলত মাথাপিছু গোমাংস পরিভোগে আমরা খুবই পিছিয়ে। তবে ঈদের সময়ে গরিবের পাতেও ওঠে গরু-ছাগলের মাংস। কোরবানি দিতে অক্ষমদের মধ্যে মাংস বিতরণের সংস্কৃতি রয়েছে এ অঞ্চলে। যারা বছরে একবারও গোমাংস খেতে পান না, তারাও এ সময়ে এর স্বাদ নিতে পারেন। রান্নার সুযোগ না থাকায় অনেকে সেটা বিক্রি করেন বাজারদরে। গরু-ছাগলের চামড়ার দামে ধস নামায় এর অর্থ অবশ্য কম পাচ্ছে দরিদ্ররা। কোরবানির চামড়ার ওপর কিছুটা নির্ভর করে আসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
উষ্ণ আবহাওয়া এবং থেমে থেমে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে এবার উদযাপিত হবে ঈদ। এ কারণে পশু কোরবানি কমবে না। এটা কমবে মানুষের হাতে অর্থ কম থাকলে। অর্থ থাকলেই মানুষ বেশি খরচ করবে, তাও নয়। ভবিষ্যৎ উপার্জনের প্রত্যাশা এ ক্ষেত্রে বড় বিষয়। গরু-ছাগলের দামও এতে প্রভাব রাখবে। দাম বাড়লেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণে উৎসাহী মানুষ অবশ্য পশু কোরবানিতে পিছিয়ে আসে না। পশুপালনকারীদের প্রতি শুভেচ্ছার মনোভাবও কাজ করে অনেকের মধ্যে। তারা তো জানেন, কোরবানির ঈদে শহর থেকে গ্রামে আর ধনী থেকে দরিদ্রদের মাঝে আয়ের পুনর্বণ্টন হয়। সমাজে কিছুটা হলেও বাড়ে ন্যায্যতা। আর এতে রয়েছে মিলন ও স্বস্তির বার্তা।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- কোরবানি
