পবিত্র হজ
লাব্বাইক– আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ঘোষণা
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সৌদি আরবের মক্কায় আজ সারাবিশ্ব থেকে আগত হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন। আরাফার দিন শুধু একটি দিন নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা, কান্না, ক্ষমা ও রবের নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। মহান আল্লাহ সুরা আল ইমরানের ৯৭ আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ আরাফার দিনকে হজের মূল বলা হয়েছে। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন– ‘হজ হলো আরাফা।’
হজের তিনটি মূল ফরজ বা আবশ্যিক কাজের মধ্যে আরাফায় অবস্থান করা অন্যতম। হজের মূল দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজ জোহরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা এবং আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকা ওয়াজিব। এ বছর সারাবিশ্ব থেকে ১৫ লাখের বেশি মানুষ হজ করছেন, যেখানে বাংলাদেশের প্রায় ৭৯ হাজার হজযাত্রী অংশ নিয়েছেন। কী অপার সৌভাগ্য!
একটি কবুল হজ মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। তাই আজ আমাদের হৃদয়ও যেন আরাফাতের ময়দানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আমরা কান্নাভেজা কণ্ঠে আল্লাহর কাছে বলি– ‘হে আল্লাহ! আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের অন্তর পবিত্র করুন, আমাদের হজে যাওয়ার তাওফিক দিন এবং আমাদের জীবনকে আপনার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।’
হজের মৌসুম এলেই মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অন্য রকম আবেগের সঞ্চার হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ সাদা ইহরাম পরে ছুটে যান আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবার দিকে। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো– ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেন– ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ এই ধ্বনি শুধু মুখের শব্দ নয়; এটি একজন বান্দার অন্তরের গভীর থেকে মহান রবের ডাকে সাড়া দেওয়ার ঘোষণা।
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। মহান আল্লাহ সুরা আল ইমরানের ৯৭ আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘মানুষের মধ্যে যাদের, সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য, আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই ঘরের হজ করা তাদের ওপর ফরজ।’
হজ মানুষের জীবনে তাকওয়া, ধৈর্য, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। হজের প্রতিটি কাজের মধ্যেই রয়েছে গভীর তাৎপর্য। সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়ানো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হজরত হাজেরা (আ.)-এর অসীম ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার কথা। আরাফার ময়দানে লাখো মানুষের কান্নাভেজা দোয়া কেয়ামতের দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা শেখায়– জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকতে হবে।
হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকল, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।’– (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
হজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন সবাইকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে। তাই এই ইবাদত মানুষের অন্তরকে নরম ও অহংকার দূর করে এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়।
হজের এই পবিত্র সময়েই আসে পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি। কোরবানি মূলত আত্মত্যাগের এক মহান শিক্ষা। হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। তাদের এই আনুগত্য ও ত্যাগকে স্মরণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি আদায় করে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ – (সুরা হজ: ৩৭)
অতএব কোরবানির মূল উদ্দেশ্য পশু জবাই নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা ও পাপ প্রবৃত্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করা। ঈদুল আজহা মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য ও মানবতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজ যারা আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে হজ পালন করছেন, তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান। তাদের দিকে তাকালে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে কাবার প্রতি ভালোবাসা জেগে ওঠে। চোখের পানি অজান্তেই
ঝরে পড়ে এই আশা নিয়ে– হয়তো একদিন আমরাও সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে বলব, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’
হজ বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের প্রতীক। ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার শিক্ষা দেয় হজ। সারাবিশ্ব থেকে মুসলমানরা মক্কায় হাজির হয়। কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকে– হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন। আমাদের জীবনে হজের শিক্ষা, কোরবানির ত্যাগ এবং তাকওয়ার সৌন্দর্য দান করুন। যারা হজে গেছেন তাদের হজ কবুল করুন এবং যারা যেতে পারেননি তাদেরও শিগগিরই আপনার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান,
ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
