ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঈদবাজারে অনলাইন লেনদেন

ঈদবাজারে অনলাইন লেনদেন
×

ঈদবাজারে জনপ্রিয় হচ্ছে ক্যাশলেস লেনদেন। প্রতীকী ছবি

খান মাহবুব

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১৬:৫৯

বাংলাদেশে উৎসব হিসেবে সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়ায় ঈদ। ধনী-গরিব সবার জন্য কমবেশি অর্থের প্রবাহ ঘটিয়ে আনন্দ উদযাপনের বিধিব্যবস্থা মুসলিম ধর্মীয় অনুশাসনে বিরাজমান। ঈদের উৎসবের মধ্যেও আছে আনন্দ-ত্যাগ ইত্যাদির মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির পথ। তবে সব ছাপিয়ে ঈদ অর্থের তারল্যের এক বড় ক্ষেত্র। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ঈদের আয়োজনে ক্রমশ লুপ্ত। এখন ঈদ সমাজের সর্বময় ব্যবসা-বাণিজ্যের সাংবাৎসরিক সবচেয়ে বড় আয়োজন।

আধুনিকতা যতই সামনে হাঁটছে, মানুষ যাপিত জীবন সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার ব্রত নিয়ে চলছে। অর্থের লেনদেনে ধাতব ও কাগজের মুদ্রা এখন রূপান্তর হয়েছে ইলেকট্রনিক চিপে অনলাইন ট্রান্সফারসহ ই-প্ল্যাটফর্মে। ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে ঈদের বাজারে যাওয়ার পরিবর্তে এখন লোকপ্রিয় হচ্ছে ক্যাশলেস ওয়ালেট কিংবা প্লাস্টিক মানি বা ক্রেডিট কার্ড। নগদ অর্থবহনের ঝুঁকি, ঝামেলা, নকল টাকা ইত্যাদি অসুবিধা হতে পরিত্রাণের জন্য অনলাইন পেমেন্ট লোকপ্রিয় হচ্ছে। 

ঈদের মৌসুমে অনলাইন আর্থিক ব্যবস্থাপনা নতুন ধ্রুপদ নিয়ে হাজির হচ্ছে। এই সুযোগে জমজমাট ও তীব্র বিপণন বাজারের লড়াইয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ে আসে অভাবনীয় সব ঈদ অফার। 

অগ্রবর্তী চিন্তার প্রতিষ্ঠান ঈদের উৎসবকে সামনে নিয়ে সম্প্রতি বছরগুলোয় নির্দিষ্ট পেমেন্ট গেটওয়ে বা কার্ড ব্যবহার করলেই কেনাকাটায় মিলছে ১০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক বা ইনস্টান্ট ডিসকাউন্ট। তবে এসব সুবিধা সাদা চোখে যেমন দেখা যায়, বাস্তবতা তেমনটা নয়। কার্যক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। যেমন- একটি মোবাইল নম্বর থেকে দিনে সর্বোচ্চ ২০০-৩০০ টাকার বেশি ক্যাশব্যাক পাওয়া যাবে না। কাজেই জেনে বুঝে অপারেশন করতে হবে। ২০২৬-এ ঈদুল আজহা সামনে রেখে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ‘ডিজিটাল ঈদ ধামাকা’ বা মেগা সেভিংস ফেস্টের মতো আয়োজন এখন ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ছে।

সময় বদলাচ্ছে, পেমেন্টের ধরন বদলাচ্ছে। এখন শপিংমলে ঈদের সময় ক্রেতা দ্রব্য পছন্দ করে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে প্রথমে সন্ধান করে কিউআরকোড। কারণ বেশিরভাগ বড় প্রতিষ্ঠানে কিউআরকোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করলে লোভনীয় ডিসকাউন্ট অথবা ক্যাশব্যাক মেলে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে তাদের মুনাফার অংশ থেকে ক্রেতাদের সঙ্গে কিছুটা ভাগবণ্টনেও রাজি। তাই নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম কার্ডের ক্ষেত্রে ‘বাই ওয়ান নোট ওয়ান’ সার্ভিস।

আমাদের বেড়ে ওঠার বয়সে প্রান্তিক পর্যায়ে ঈদুল আজহার সময়ে কোরবানির হাটে দেখেছি আর্থিক অব্যবস্থাপনার চিত্র। নকল টাকা, কোরবানির পশু বিক্রির টাকা ছিনতাই নিত্যনৈমত্তিক বিষয় ছিল। এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ ক্রিয়াশীল হয়েছে। ব্যাপারী ও খামারিরা যেন লেনদেনে নিরাপত্তা পায় এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যৌথ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় খামারিদের স্মার্ট সেবার আওতায় আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। হাটে এখন ব্যাংকের বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এসব বুথ ব্যবহার করে নগদ টাকার লেনদেন পরিহার করে ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর করা যায়। এছাড়া, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কোরবানির পশুর হাটের আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তায় টাকা স্থানাত্তরে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। 

২০২৬ সালে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কমবেশি তিন হাজার ৬০০টি পশুর হাট বসবে। এসব হাটে কোরবানির জন্য এক কোটি ২৩ লাখের বেশি উপযুক্ত পশু আছে। সহজেই অনুমেয় কোরবানির হাটের লেনদেন কত বড় অঙ্কের হতে পারে। ২০২৫ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৯টি হাটে ১৪টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। ওই বছর ক্যাশলেস লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি টাকার বেশি। সবচেয়ে বড় বিষয় কোরবানির হাটের চিরায়ত লেনদেনের চিত্রকে বদলে দিচ্ছে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেন।

মানুষ বাজারে গিয়ে দরদাম করে পরখ করে জিনিস কেনায় অনীহা বাড়ছে। সময়-সুযোগের অভাব তো আছে- সঙ্গে বাজারে যাওয়ার ঝামেলা নিতে চাচ্ছে না বর্তমান প্রজন্ম। এই সুযোগে সুপারশপগুলোর আছে নিজস্ব ওয়েবসাইট বা স্মার্টফোন অ্যাপ। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ থেমে নেই। ঈদকে উপলক্ষ করে সাজায় শাড়ি, পাঞ্জাবি, গয়নাসহ হরেক রকম পণ্যের ডিজিটাল পসরা। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে গত মার্চ মাস পর্যন্ত আট মাসে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ই-কমার্স লেনদেন হয়েছে। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২০ মে ২০২৬) 

২০২৬ সালে ক্রেতাদের বিগত দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা কমাতে ই-কমার্স বেশি কিছু সুযোগ তৈরি করছে কেনাকাটায়। বিগত দিনে ভার্চুয়াল স্কিনে পণ্য দেখে খরিদ করে অনেক ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ আছে। তাই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী পণ্য প্রদর্শন, ভার্চুয়াল ট্রায়ালরুম, থ্রিডি ভিউয়ের মাধ্যমে পণ্য যাচাই করে খরিদের সুযোগ সৃষ্টি করে ক্রেতাকে অধিক আস্থায় আনার চেষ্টা চলছে। এখন স্লোগান হচ্ছে- ‘পেমেন্ট হবে ক্যাশলেস, কেনাকাটা হবে এন্ডলেস।’

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), টাকা গ্রহণে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) কিউআরকোড ব্যবহার আস্তে আস্তে রীতিতে পরিণত হবে‌, সরকারও বিষয়টিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পুরোটাই এখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। সরকার বিভিন্ন নাগরিক সেবা যেমন ভূমির খাজনা থেকে জমির রেজিস্ট্রেশন ফি এখন ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণ করছে। এতে সহজলভ্যতার সঙ্গে স্বচ্ছতাও বেড়েছে। এখন গড়ে কেনাকাটা ও সেবা বিল পরিশোধে প্রতিমাসে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি অনলাইন লেনদেন হয়। ঈদকে উপলক্ষ করে এই লেনদেন অনেক প্রসারিত হয়। 

ঈদ উৎসব তো বটেই সারা বছর ডিজিটাল মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেনে বিকাশ, নগদসহ নানা মাধ্যমে টাকা পাঠাতে ও ক্যাশ আউট করতে যে টাকা গুনতে হয় তা কোনো বিচারেই যৌক্তিক নয়। এ বিষয়ে একটা গ্রহণীয় ব্যয় নির্ধারণ প্রযোজন। অনলাইন বেচাকেনায় কোনো পক্ষ যেন প্রতারিত না হয় তার জন্য একটা সর্বজনীন পরিকাঠামো প্রণয়ন ও মান্যতা প্রয়োজন। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্সসহ নানা মাধ্যমে লেনদেন বাড়াতে অন্তভূক্তিমূলক কার্যক্রম জরুরি। নিরাপত্তা সচ্ছতা ও সেবার মানের উন্নয়ন জরুরি। এ বিষয়ে ঈদ উৎসবকে উপলক্ষ ধরে প্রচারণা চালালে ও আস্থা পেলে আগামীতে কাগজের নোটবিহীন একটা স্মার্ট অর্থনীতির পথ সুগম হবে।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×