ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হামের সংক্রমণ এবং ঈদযাত্রার সতর্কতা

হামের সংক্রমণ এবং ঈদযাত্রার সতর্কতা
×

শাহ্‌নাজ মুন্নী

শাহ্‌নাজ মুন্নী

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ১৯:০৫

এটাতো সবাই স্বীকার করবেন যে প্রতিটি পরিবারেই শিশুরা হচ্ছে বিশুদ্ধ আনন্দের জীবন্ত উৎস। তাদের নির্মল হাসি, ছোট ছোট নরম হাত পা, কালো নিস্পাপ চোখ যতখানি শান্তি দেয় পৃথিবীর অন্য কিছুই হয়তো হৃদয়কে ততখানি শান্ত করে না। এহেন শিশুকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা একটি পরিবারকে দুস্থ ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার বেদনাময় অনুভূতি দেয়। এই অনুভূতি নিয়েই এবার হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০০ বা তারচে বেশি শিশুর পরিবার ঈদ-উল-আযহা কাটাবেন। তাঁদের কাছে ঈদ কোন আনন্দ বয়ে আনবে না বরং শিশু হারানোর সুতীক্ষè বেদনা মনের মধ্যে চিরস্থায়ী কাঁটার মতোন বিঁধে থাকবে। যে শিশুর হাসিতে, কান্নায়, অর্থহীন আনন্দ ধ্বনিতে বা এক পা দু পা ফেলে টলমল করে হাঁটার প্রচেষ্টায় ঘর ভরে থাকার কথা সেই ঘরে বিরাজ করবে ধূ ধূ শূন্যতা ও গভীর শোক ও হাহাকার।

কারো হয়তো ঈদের দিনেও অসুস্থ শিশুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন দিন কাটবে হাসপাতালের বিছানায়। অক্সিজেন মাস্ক, নার্স আর ডাক্তারদের মাঝখানে ভয়, দুশ্চিন্তা আর সন্তান হারানোর অসহায় আতংক বুকে নিয়ে কাটবে প্রতিটা মুহুর্ত। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৭ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে জীবন হারাচ্ছে। গত কয়েক দশকে শিশু মৃত্যুর এমন হৃদয়বিদারক চিত্র বোধহয় আর দেখা যায়নি।

সেই করোনার সময় আমরা প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা গুণতাম, তবে তার অধিকাংশই ছিল বয়স্ক মানুষ। এবারো সেই সংখ্যা গোণা হচ্ছে, তবে তা শিশু মৃত্যুর।

চারপাশে কত রকমের কথা শুনতে পাচ্ছি, হামের টিকা দেযা হয়নি সময় মতো, অন্তবর্তী সরকারের অবহেলা ও অদক্ষতার কথা উঠে আসছে। কার দায়? কে দায়ী? এমন প্রশ্ন উঠছে। চলছে দোষারোপের রাজনীতি। আবার শুনতে পাচ্ছি হামে নয় বরং হামের পর নিউমোনিয়া হয়ে শিশুরা মারা যাচ্ছে বেশি। কেউ বলছেন, যে শিশুরা অপুষ্টির শিকার তারাই হামের সাথে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। কারো হচ্ছে ডায়রিয়া। দেখা যায়, অপুষ্টিতে আক্রান্ত মায়েরা জন্ম দিচ্ছে অপুষ্ট শিশু। সে এক অদ্ভুত দুষ্ট চক্র।

কেউ বলছেন, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কথা। সময়মতো হাসপাতালগুলোতে সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে হয়তো এত শিশুর মৃত্যু হতো না। এর সবই কঠিন সত্য কিন্তু নির্মম সত্যটা হচ্ছে এই যে, আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে। মানে একেকটা স্বপ্ন মারা যাচ্ছে। মানে একেকটা আশা নিভে যাচ্ছে। বিকশিত হওয়ার আগেই জীবন হারিয়ে যাচ্ছে। একটা কথা আছে, যার যায়, সেই বোঝে। অন্যেরা হয়তো চেষ্টা করে সমব্যথী হতে পারে কিন্তু প্রকৃত বেদনা বোঝা অসাধ্য। 

হামের এই উচ্চ প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও বছরের নিয়মে উৎসব এসেছে। ঈদ উৎসব উদযাপন করতে পরিবার পরিজন নিয়ে মানুষজন ছুটছে গ্রামের বাড়িতে। প্রতিবছরই এই যাওয়া আসা চলে। এটাই এ অঞ্চলের রীতি। এর সাথে মানুষের আবেগও জড়িত। সারা বছর অনেকে অপেক্ষা করে থাকেন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য।

গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ রাজধানী ছেড়ে ঈদ করতে নিজেদের গ্রামে যান। শেকড়ের কাছে যান। তাদের সঙ্গে পরিবারের শিশুরাও থাকে। এই ঈদযাত্রায় স্বাভাবিক ভাবেই যানবাহনে থাকে মানুষের অতিরিক্ত ভীড়, চাপাচাপি, লোক সমাগম। এই ভীড়ের মধ্যে যদি আক্রান্ত কোন শিশু থাকে তবে তার মাধ্যমে অন্য শিশুদের মধ্যেও হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।  

ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি,  হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত একটি রোগ। বলা হয় বিশে^র সবচে বেশি সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে হাম অন্যতম। এটি খুব সহজেই একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তির হাঁচি কাশি থেকে হামের জীবাণু ছড়ায়। আবার বাতাসের মাধ্যমেও ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঠিক সময়ে (অর্থাৎ ৯ থেকে ১২ মাস বয়সের মধ্যে প্রথম ডোজ ও পরে ১৫ থেকে ২৪ মাস বয়সের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ) টিকা না নিলে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আমরা বাছবিচার না করেই অনেক সময় শিশুদের স্পর্শ করি, আদর করি। বুঝতেও পারি না, আমাদের অজান্তেই অদেখা জীবাণূরা এই সুযোগে শিশুকে কাবু করে ফেলতে পারে। তাই সবার প্রয়োজন সঠিক তথ্য জানা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, সতর্ক না হলে ঈদের পর শিশুদের হামের সংক্রমণ আরো বেড়ে যেতে পারে। যা হবে মারাত্মক। ফলে আতংকিত না হয়ে রোগ যাতে না ছড়ায় এ ব্যাপারে সরকারসহ, অভিভাবক ও সংশ্লিস্ট সকলকেই উদ্যোগী হতে হবে। সাবধান হতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে সচেতন করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারণাও বাড়াতে হবে। গণপরিবহনে ও ভীড়ে বয়স্ক মানুষ ও সম্ভব হলে শিশুদেরও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

আত্মীয় স্বজন বা প্রতিবেশিদের বাড়িতে হাম আক্রান্ত শিশু থাকলে বা কারো জ¦র হলে সেই বাড়িতে সুস্থ শিশুদের নিয়ে যাওয়া যাবে না। শিশুরা এমনিতেই নাজুক। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। হামের বিস্তার রোধ করতে সময়মতো শিশুদের টিকা নেয়া নিশ্চিত করতে হবে পাশাপাশি তাদেরকে দুষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কম মানুষের সংস্পর্শে রাখতে হবে।

একসময় বাংলাদেশ থেকে হাম প্রায় নির্মুল হয়ে গিয়েছিল। এই রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার খবর কমই পাওয়া যেত। চেনা পরিচিতজনদের মধ্যে দেখেছি হামে আক্রান্ত হলেও সাত দিনের মধ্যে শিশুরা আবার সেরে উঠতো। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রতিরোধযোগ্য হাম আবার প্রাণঘাতি হয়ে ফিরে এসেছে।  
আমরা কেউ-ই চাই না পৃথিবী থেকে আমাদের শিশুরা অকালে ঝরে যাক।

তাই হামের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ঈদের আনন্দের মধ্যেও শিশুর অভিভাবকদের সতর্ক ও সচেতন থাকার কোন বিকল্প নেই। যেসব এলাকায় হামের প্রকোপ বেশি সেসব এলাকায় সুস্থ শিশুদের নিয়ে না যাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত ভীড়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও রোগাক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

আনন্দ করতে গিয়ে যেন আমরা নিরানন্দকে ডেকে না আনি। ঈদ উদযাপনের মাঝে একটু বাড়তি সতর্কতা আমাদের শিশুদের অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। আপনাদের সবার ঈদ আনন্দময় ও নিরাপদ হোক। আমাদের শিশুরা হামের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা পাক।

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×