ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কাঁটাতারের বেড়া: সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা, নাকি মৃত্যুর ফাঁদ?

কাঁটাতারের বেড়া: সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা, নাকি মৃত্যুর ফাঁদ?
×

ফাইল ছবি

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ | ১৯:৪১ | আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ | ২০:২০

পশ্চিমবঙ্গের নবমূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি পাবে বিএসএফ। গত ১১ মে এই ঘোষণার জন্ম দিয়েছে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে নতুন আলোচনার।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্ত যা র‍্যাডক্লিফ লাইন নামে পরিচিত। ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার (২,৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ এ সীমান্ত দৈর্ঘ্য বরাবর ভারতের পাঁচটি রাজ্য অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম।

দীর্ঘ এই সীমান্ত শুধু দুটি রাষ্ট্রকে আলাদা করেনি; এটি বিভক্ত করেছে ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা, জীবিকা ও স্মৃতিকে। সীমান্তের দুই পাশে একই পরিবারের মানুষ বাস করে, একই নদীর পানি পান করে, একই সীমান্তহাটে কেনাবেচা করে। অথচ এই সীমান্তই আজ কাঁটাতার, গুলি আর মৃত্যুর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে তাদের ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে আসছে। তাদের যুক্তি—অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য এই বেড়া অপরিহার্য। অন্যদিকে বাংলাদেশে বহু মানুষের কাছে এই কাঁটাতার একটি ভয়াবহ মৃত্যুর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ সীমান্তে ৩ হাজার ২৩৯ দশমিক ৯২ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, যা মোট সীমান্তের ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এখনো ৮৫৬ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার বা ২০ দশমিক ৯২ শতাংশ সীমান্তে বেড়া বসানো হয়নি। এর মধ্যে ১৭৪.৫১৪ কিলোমিটার নদী ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ‘নন-ফিজিবল গ্যাপ’ হিসেবে চিহ্নিত। বাকি অংশে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বিজিবির আপত্তি, সীমিত কর্মমৌসুম, ভূমিধস ও জলাভূমির কারণে কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। তবে এ সীমান্ত নিয়ে আলোচনার আরও একটি কারন, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্ত।  

কতো মানুষ প্রাণ হারালো সীমান্তে

সীমান্তে হত্যা কাঁটাতারের বেড়ার সবচেয়ে কালো অধ্যায়। বিএসএফের গুলিতে বছরের পর বছর বাংলাদেশিরা মারা যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, এর বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে ২০১৬–২০২৪ সময়ে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বছরে প্রায় ১৫–৫১ জনের মধ্যে ওঠানামা করেছে। বিএসএফের হাতে ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন (সূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০);

২০১৬ সালে ২৮, ২০১৭ সালে ৩০, ২০১৮ সালে ১৫, ২০১৯ সালে ৪২, ২০২০ সালে ৫১, ২০২১ সালে ১৮, ২০২২ সালে ২৩, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৫ সালে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান।

প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মানবিকতার সীমা অতিক্রম করতে পারে? কাঁটাতারের বেড়া কি শুধুই সার্বভৌমত্বের প্রতীক, নাকি এটি ধীরে ধীরে ‘মৃত্যুর বৈধতা’ তৈরি করছে? ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বহু বছর ধরেই সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নীতির শিকার হচ্ছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। বিরামহীন হত্যা সত্ত্বেও সুরাহা নেই; আছে রাজনৈতিক সমাধানের পরামর্শ।

 ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। কাঁটাতারের বেড়া সার্বভৌমত্বের চেয়ে জীবনহানির সাথে বেশি জড়িত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বলছে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী কেবলমাত্র চরম আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করতে পারে না। একজন নিরস্ত্র অনুপ্রবেশকারী কিংবা গরু পাচারকারীকে গুলি করে হত্যা করা কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য নীতি হতে পারে না। আইন আছে, গ্রেপ্তার আছে, বিচার আছে—কিন্তু গুলি কেন?

‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি’

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি’। সীমান্তকে কেবল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে; অথচ এটি একটি মানবিক ভূগোল। সীমান্তের বহু মানুষ দরিদ্র। তাদের জীবন-জীবিকা, কৃষিজমি, নদী, এমনকি বাড়ির উঠান পর্যন্ত সীমান্তের খুব কাছে। অনেকে ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করে, কেউ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে দারিদ্র্যের কারণে, আবার কেউ অবৈধভাবে কাজের খোঁজে যায়। এটি অপরাধ হতে পারে, কিন্তু অপরাধের শাস্তি মৃত্যু নয়।

 দুই দেশ বহুবার সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যে নামিয়ে আনার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও এই অঙ্গীকার এসেছে। কিন্তু বাস্তবে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভারতে ভালো ও বিশ্বস্ত সম্পর্কের কথা বলা হলেও সীমান্ত হত্যা কখনই থেমে ছিলো না।

কাঁটাতার কি অবিশ্বাসের প্রতীক?

সীমান্ত কখনোই কেবল ভৌগোলিক রেখা নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। কাঁটাতারের বেড়া কেবল নিরাপত্তা দেয় না; এটি মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনও তৈরি করে। ভারত যখন সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী বেড়া নির্মাণ করে, তখন বাংলাদেশিদের একাংশের মধ্যে ‘অবিশ্বাস’ ও ‘অবমাননার’ অনুভূতি জন্ম নেয়। কারণ এই বেড়াকে অনেকে দেখে প্রতিবেশী বন্ধুত্বের বদলে সন্দেহের প্রতীক হিসেবে। ভারত যদি সত্যিই তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চায়, তাহলে তাকে আরও আধুনিক ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। নজরদারি প্রযুক্তি, যৌথ টহল, তথ্য বিনিময়, অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার—এসব হতে পারে কার্যকর বিকল্প। বিশ্বের বহু দেশ সীমান্ত রক্ষা করে, কিন্তু প্রতিদিন মানুষ হত্যা করে না।

বাংলাদেশের করণীয় কী?

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁটাতার গবাদি পাচার, শরণার্থী প্রবেশ এবং জঙ্গিবাদ রোধ করে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। ২০২৬ শেষ নাগাদ সম্পূর্ণ ফাঁক-মুক্ত বেড়া লক্ষ্য। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি সার্বভৌম অঞ্চলে অননুমোদিত নির্মাণ—ল্যান্ড বাউন্ডারি অ্যাগ্রিমেন্ট সত্ত্বেও সমস্যা অমীমাংসিত। বেড়া ৩০০০ কিমি অতিক্রম করলেও হত্যা বাধা পায়নি, যা যুক্তিকে দুর্বল করে। বাংলাদেশেরও দায় কম নয়। সীমান্ত এলাকায় দারিদ্র্য, চোরাচালান চক্র ও দুর্বল স্থানীয় প্রশাসনের কারণে বহু মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। সীমান্তবাসীর জন্য বিকল্প অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। সীমান্তে কাঁটাতার থাকতে পারে। একটি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা যদি প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি আর শুধু সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন থাকে না; সেটি মানবিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিহাস, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ ও অর্থনীতির গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। সেই সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বড় দাগ সীমান্ত হত্যা। দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সত্যিই বন্ধুত্বের কথা বলে, তবে সীমান্তে প্রথম কাজ হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা করা। কারণ কাঁটাতার রাষ্ট্রকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু একটি মায়ের কান্নাকে থামাতে পারে না। সমস্যার মূল অবৈধ অর্থনীতি—গবাদি, মাদক, অস্ত্র পাচার। যৌথ পেট্রোলিং, ড্রোন এবং ফ্লাডলাইটিং (২০২৬-এ প্রসারিত) ব্যবহার করে হত্যা কমানো যায়। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ এবং যৌথ তদন্ত কমিশন দরকার। শেষ পর্যন্ত, কাঁটাতার জীবন রক্ষার অজুহাত হয়ে উঠলে সার্বভৌমত্ব অর্থহীন। দুই প্রতিবেশীকে কূটনৈতিক সংলাপে ফিরতে হবে।

ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

আরও পড়ুন

×