সমকালীন প্রসঙ্গ
হাজ্জাজের বক্তব্য প্রত্যাহারেও প্রশ্নগুলো রয়ে গেল
ফাইল ছবি
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ২০:০৮
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ যদিও তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা থামছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে তিনি মোটাদাগে দুটি কথা বলেছেন, প্রথমটি হল, এটি ‘কোচিং সেন্টার’ আর দ্বিতীয়টি হল ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যা রিসার্চ করে, তার কানাকড়িও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে না’।
ববি হাজ্জাজের দুটি কথাই যে অতিরঞ্জন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে বক্তব্যগুলো প্রত্যাহার করে আত্মপক্ষ সমর্থনের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন, এগুলো কেবল তার ব্যক্তিগত ‘চিন্তা ও মতামত’ সরকারের নয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কেউ যদি এমন চিন্তা পোষণ করে, তা নিশ্চয়ই ভয়ংকর। তিনি যখন সরকারের মন্ত্রী তখন ব্যক্তিগত কথাবার্তায়ও যা ইচ্ছে বলতে পারেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্খিত গবেষণা করছে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ার পরও আমি বা আমরা অনেকেই এর গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে সমালোচনা করি। কিন্তু ববি হাজ্জাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষার প্রয়োগ দেখা গেছে, তা খুবই আপত্তিকর। তিনি ফেসবুক পোস্টে যদিও বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি চান বলেই তিনি এসব বলেছেন, বাস্তবে তার কথায় সে ধরনের ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি।
বস্তুত সে কারণেই সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তব্যের ব্যাপক সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। কারও সংশোধনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা, আর কাউকে হেয় করার জন্য সমালোচনা এক নয়। ভাষার মধ্যেই তার বাস্তবতা ফুটে ওঠে। ববি হাজ্জাজ যদি বলতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্খিত গবেষণা হচ্ছে না, তার ভিন্ন অর্থ বোঝা যেত। এমনকি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তিকেও যেভাবে টেনে এনেছেন, তার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভালো যে গবেষণা হয় তার পরিমাণ যাই হোক, তাদের অপমান করেছেন। আর কোচিং সেন্টার বলার মাধ্যমে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই নয়, এর সকল শিক্ষার্থীদেরও অবজ্ঞা করেছেন।
বলাবাহুল্য, তার বক্তব্য পক্ষপাত দোষেও দুষ্ট; তিনি কিছুদিন আগেও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। বক্তব্যে তথ্যগত বিভ্রান্তিও আছে। গতকাল ফেসবুকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একটি পরিসংখ্যান শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে, ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা মিলে স্কোপাস ইনডেক্স জার্নালে যতটি বিশ্বমানের গবেষণা প্রকাশ করেছেন, তা উল্লেখিত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত প্রকাশনার চাইতেও বেশি।
ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের প্রতিবাদ অনেকেই জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার কথাও বলেছি। এই চাপে পড়ে হোক বা আত্মোপলব্ধি থেকে হোক, হাজ্জাজ বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত হবে তার শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগী হওয়া। আমরা দেখেছি, ববি হাজ্জাজের বক্তব্য ঘিরেই পক্ষে-বিপক্ষে উভয় দিকেই মানুষ কথা বলেছেন। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, অন্তত গবেষণার দিক থেকে তা পূরণ করতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাং কিংয়ের কথা বলাই বাহুল্য।
শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত নিজেদের প্রতিবন্ধকতাগুলো বের করা। ছাত্র-শিক্ষকের রাজনীতি ও দলীয়করণ এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা, এ পথ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বের হতেই হবে। ইতিমধ্যে মেধার চাইতে দলীয় কারণে অনেক শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এখানে রাজনীতিক দল বিশেষ করে, ক্ষমতাসীনদেরও দায় আছে। চলতি মাসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক এক কর্মশালায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির র্যাং কিংয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণ, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ।
এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতি গঠনে অবদান রেখে আসছি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ ও সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিয়েছে, সে বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণায়ও বিশ্বমান ও জনপ্রত্যাশা অর্জন করুক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সে সদিচ্ছা আমরা দেখতে চাই।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
